অনলাইন বন্ধুত্বের ফাঁপা বাস্তবতা

অনলাইন বন্ধুত্ব এখন আর নতুন শব্দ নয়। বরং এ যুগে সম্পর্কের প্রথম পরিচয়নের ভাষা হয়ে উঠেছে। যে সময়ে সাক্ষাৎ কঠিন, সময় সংকুচিত, কাজের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শহরগুলোতে ভিড়ের মধ্যে একাকিত্ব ঘন হয়েছে, সেই সময়ে অনলাইন বন্ধুত্ব মানুষের কাছে এমন এক স্থান তৈরি করেছে যেখানে সম্পর্কের পক্ষে সময়ের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না, শারীরিক উপস্থিতিরও দরকার নেই। শুধু প্রোফাইল, চ্যাটবক্স, ইনবক্স; মানুষ অনায়াসে পরিচিত, কথা বলা, হাসাহাসি, সমর্থন এবং কখনো কখনো আবেগিক আশ্রয়ের সন্ধান পায়। বাংলাদেশে এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে স্পষ্ট, কিন্তু তার ভিতরেই ফাঁপা বাস্তবতার গন্ধ লুকিয়ে আছে। সেই গন্ধ কখনো মিষ্টি, কখনো বিষাক্ত, আবার কখনো নিছক আগুনহীন ধোঁয়া।
মানুষ বন্ধুত্ব করে মূলত বোঝা ভাগাভাগি করতে, চিন্তায় সঙ্গী খুঁজতে, জীবনের প্রশ্ন ও আনন্দ নিয়ে কথা বলতে। বাস্তব বন্ধুত্বে এই ভরসা গড়ে ওঠে সময়, আচরণ, উপস্থিতি ও দায়িত্বের ওপর। অনলাইনে এই উপাদানগুলো আংশিক বা প্রতিস্থাপনমূলক রূপে আসে। সেখানে উপস্থিতির স্থানে থাকে ‘অনলাইন স্ট্যাটাস’, সময়ের স্থানে থাকে ‘রিপ্লাই স্পিড’, দায়িত্বের স্থানে থাকে ‘লাইক, হার্ট বা রিঅ্যাকশন’। ফলে সম্পর্ক জন্ম নেয়, কিন্তু যে মূল উপাদানগুলো বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে তা নড়বড়ে হয়ে যায়। অনলাইন বন্ধুত্বকে তাই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলা যায় না, আবার সম্পূর্ণ গভীরও বলা যায় না। দুইয়ের মাঝামাঝি এক অবস্থা, যেখানে বন্ধুত্বের কাঠামো আছে, কিন্তু তার ভরসা পরীক্ষিত নয়।
গ্লোবাল দুনিয়ায় এর শেকড় ইন্টারনেটের প্রথম যুগেই। ২০০০ সালের শুরুতে মেইল ও ফোরামে পরিচয়ের মধ্যেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠত। এরপর আসে চ্যাটরুম, সোশ্যাল মিডিয়া, গেম, অনলাইন কমিউনিটি। যুক্তরাষ্ট্রে MySpace, ইউরোপে Messenger, জাপানে Mixi, কোরিয়ায় Cyworld- প্রত্যেক জায়গায় এক নতুন সামাজিকতা জন্ম দেয়। বাংলাদেশে তখন ইন্টারনেট ছিল সীমিত, বেশি ছিল কম্পিউটার ক্লাব, সাইবার ক্যাফে। অনলাইন বন্ধুত্বের প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে স্মার্টফোন -ইন্টারনেট-ফেসবুক যুগে, যার সাথে যুক্ত হয় মোবাইল ডেটার দাম কমে যাওয়া। কোভিড সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যখন বাস্তব সাক্ষাৎ বন্ধ, তখন অনলাইন সাক্ষাৎই হয়ে ওঠে একমাত্র সামাজিকতা।
বাংলাদেশের শহরের তরুণরা অনলাইন বন্ধুত্বের প্রধান ভোক্তা। কারণ নগর জীবন ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ। পরিবার, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সামাজিক প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে বাস্তব বন্ধুত্বের জন্য অবসর কমে যায়। ফলে মানুষ এমন বন্ধুত্ব খুঁজে যেখানে ঝামেলা কম, ব্যাখ্যা কম, প্রত্যাশা কম। অনলাইন সম্পর্ক সেই সহজতা দেয়, যদিও সেই সহজতাই তার দুর্বলতা। কারণ কম প্রত্যাশা মানে কম দায়িত্ব; কম দায়িত্ব মানে কম গভীরতা। ফলে সম্পর্ক সহজেই ছিঁড়ে যায়, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। বাস্তব বন্ধুত্বে ঝগড়া মানে বিচ্ছেদ নয়; অনলাইনে ঝগড়া মানে ব্লক বা আনফ্রেন্ড।
কিন্তু অনলাইন বন্ধুত্বকে শুধু ফাঁপা বলা ভুল। কারণ মনস্তত্ত্ব বলছে, মানুষ যেখানেই সঙ্গ পায়, সেটিই সম্পর্কের স্থান। অনেক বাংলাদেশি ছেলে-মেয়ে বাস্তবে যতোটা বোঝাপড়া পায় না, অনলাইনে পায় তার থেকেও বেশি। বিশেষ করে কিশোর এবং বিশ্ববিদ্যালয় বয়সের তরুণদের মধ্যে এই অভিজ্ঞতা বেশি। বাস্তব জগতে সমাজের চোখে অনেক কথা বলা যায় না, পরিবার বা আত্মীয়ের চাপ, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, রোমান্টিক উদ্বেগ, আত্মসম্মান, ব্যর্থতা- এসব প্রশ্ন অনলাইনে সহজে বলা যায়, কারণ সেখানে বিচার কম। ফলে অনলাইন বন্ধুত্ব অনেকের জন্য মানসিক সেফস্পেস হয়ে ওঠে। এখানে সমস্যাটা ফাঁপা নয়, বরং নিরাপত্তাহীনতা। কারণ সেই সেফ স্পেস প্রায়ই অস্থায়ী। বাস্তব সম্পর্ক ভাঙলেও মানুষ কারো মুখোমুখি হয়, অভিযোগ করতে পারে, গুছিয়ে নিতে পারে; অনলাইনে সম্পর্ক ভাঙে নিঃশব্দে, চিহ্ন ছাড়া।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচয়ের কিউরেশন। অনলাইনে মানুষ নিজের এমন সংস্করণ দেখায় যা সে দেখাতে চায়। সে তার দুর্বলতা লুকাতে পারে, সাফল্য বড় করে বলতে পারে, ছবি বাছাই করে আপলোড করতে পারে, কিংবা কণ্ঠস্বর সামলে নিতে পারে। ফলে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এডিটেড সেল্ফ-এর ওপর, যা বাস্তবের চেয়ে বেশি নিখুঁত ও নিয়ন্ত্রিত। সেই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্ককে নিরাপদ করে তোলে, কিন্তু একই সাথে দুর্বল করে। কারণ একটি সম্পর্কে দ্বিধা, ভুল, রাগ, দুর্বলতা, অস্বস্তিই আসল বন্ধুত্বের উপাদান। এগুলো না থাকলে সম্পর্ক কেবল মসৃণ, কিন্তু গভীর নয়।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজে অনলাইন বন্ধুত্বের বড় আকর্ষণ anonymity ও distance। দুজন মানুষ চট্টগ্রাম-ঢাকা বা সিলেট-লন্ডন থেকেও কথা বলতে পারে। আবার ফোনে কথা বললেও দেখা না করতে পারে। দৃষ্টির অনুপস্থিতি সম্পর্ককে মুক্ত করে; কিন্তু এই মুক্তিই সম্পর্ককে বাস্তব থেকে সরিয়ে নেয়। ফলে বন্ধুত্বের প্রকৃতি বদলে যায়, intimacy থাকে, কিন্তু responsibility থাকে না। অনলাইনে সম্পর্ক টিকে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত দুজনের আগ্রহ আছে; আগ্রহ ফুরোলেই দুজনের পথ আলাদা। বাস্তব জীবনে বন্ধুত্ব এমনভাবে ফুরোয় না, কারণ বাস্তবে মানুষ মানুষকে এড়িয়ে যেতে পারে না সহজে- দেখা পড়ে, কথা পড়ে, স্মৃতি পড়ে।
অনলাইন বন্ধুত্বের আরেকটি স্তর হলো পরিমাণ। বাস্তবে মানুষ কয়জনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রাখতে পারে- তিনজন, পাঁচজন, আটজন? অনলাইনে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় শত, হাজার, কখনো দশ হাজারেও। ফলে বন্ধুত্বে একটা বাজারের চরিত্র তৈরি হয়, সম্পর্কও সেখানে পণ্যের মতো। মানুষ নিজেকে প্রদর্শন করে, অন্যরা আগ্রহ দেখায়, চ্যাট শুরু হয়, আবার হারিয়ে যায়। মানুষ বাস্তবে কখনো কারো সঙ্গে কথা বলার আগে ভাবে; অনলাইনে সেই ভাবনা কম। এই কম ভাবনার সুবিধা হলো, পরিচয় তৈরি সহজ। অসুবিধা হলো, বিচ্ছেদ আরও সহজ।
বিশ্বে আবার emotional outsourcing-এর প্রবণতা বাড়ছে, অর্থাৎ বাস্তব বন্ধুত্বের আবেগিক কাজ অনলাইনে outsource করা। কেউ মনখারাপ হলে অনলাইন বন্ধুকে মেসেজ দেয়; কিন্তু বাস্তব বন্ধুকে বলে না। কারণ বাস্তব বন্ধুর কাছে ব্যাখ্যার দায় আছে, ‘কী হয়েছে?’ ‘কেন হয়েছে?’ এসব প্রশ্নের জবাব লাগে। অনলাইনে কেউ শুধু বললেই চলে ‘মন খারাপ’। অপরজন যদি রিপ্লাই না দেয়, তাতেও কোনো দায় নেই। সম্পর্কের ভরসা যত কম, তত কম দ্বায়িত্ব। আর দ্বায়িত্ব কম হওয়া মানে সম্পর্ক আরও ফাঁপা হওয়া।
এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে অনলাইন বন্ধুত্ব কি পুরোপুরি নেতিবাচক? না, তা নয়। বরং অনলাইন বন্ধুত্ব অনেক মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। কেউ একাকিত্ব থেকে বের হয়েছে, কেউ মানসিক চাপ কমিয়েছে, কেউ নতুন ভাষা শিখেছে, কেউ সৃজনশীলতা তৈরি করেছে, কেউ ক্যারিয়ার পেয়েছে। অনলাইন বন্ধুত্ব social buffer হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষত বাংলাদেশে। কারণ এখানে পরিবার ও সমাজ চাপবদ্ধ, এবং বাস্তব কথোপকথনের জায়গা সংকীর্ণ। কিন্তু এই লাভগুলো সম্পর্ককে গভীর করে না; বরং সম্পর্কের কার্যকারিতা বাড়ায়।
মূল সমস্যাটা ফাঁপা নয়, বরং অমিল। অনলাইন বন্ধুত্বের আবেগিক গভীরতা এবং বাস্তব দায়িত্বের দূরত্ব যত বড়, হতাশা তত বেশি। মানসিক গবেষণা বলছে, অনলাইন সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি মানুষকে আঘাত করে তখন, যখন একজন ভরসা বাড়িয়ে ফেলে এবং অন্যজন তা বহন করতে পারে না।
ফলে অনলাইন বন্ধুত্বের ভবিষ্যত জটিল। একদিকে এটি মানুষের নিঃসঙ্গতা কমাবে, অন্যদিকে মানুষকে আরও একা করে ফেলতে পারে। কারণ সঙ্গ পাওয়া গেলেই একাকিত্ব দূর হয় না; সঙ্গের স্থায়িত্বই একাকিত্বকে প্রতিস্থাপন করে। অনলাইন সঙ্গ পায়, কিন্তু স্থায়িত্ব দেয় না। বন্ধুত্ব তাই অস্তিত্ব বজায় রাখে, কিন্তু বিশ্বাস কমায়। অনলাইন বন্ধুত্বকে তাই বাতিল করা যায় না; আবার পূর্ণও করা যায় না। তার অবস্থান মধ্যবর্তী, যেখানে বন্ধুত্ব জন্মায় সহজে, টিকে থাকে কৃত্রিমভাবে এবং শেষ হয় নীরবে। সেই নীরবতা কোনো চিৎকার নয়, কোনো শোকও নয়; কেবল একটি টেক্সটবক্সের পর্দা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

