বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আত্মহত্যা : ব্যক্তিগত না সামাজিক সমস্যা

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ জানুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ১৮ বার

‘আত্মহত্যা’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সমাজে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। যেন এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, একান্ত ব্যক্তির দুর্বলতা বা সাময়িক মানসিক বিপর্যয়ের ফল। বহুদিন ধরে আত্মহত্যাকে এমনভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে, একজন মানুষ নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দিল, দায়ও তার নিজেরই। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালেই বোঝা যায়, আত্মহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন, হঠাৎ ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি ব্যক্তি ও সমাজের দীর্ঘ টানাপোড়েনের ফল, যেখানে ব্যক্তির মানসিক যন্ত্রণা সমাজের কাঠামোগত চাপ, বৈষম্য, নিঃসঙ্গতা ও নীরবতার সঙ্গে জড়িয়ে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

 

মানুষ জন্ম নেয় সমাজের ভেতরেই। তার ভাষা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, সাফল্য-ব্যর্থতার মানদণ্ড; সবকিছু সমাজই নির্ধারণ করে। ফলে কোনো ব্যক্তি যখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তখন সেটি হঠাৎ নেওয়া একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসহায়ত্ব, অপমান, অবহেলা ও না পাওয়ার ইতিহাসের শেষ বিন্দু। পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্রীয় কাঠামো; সব মিলিয়ে যে পরিবেশে একজন মানুষ বড় হয়, সেখানে যদি বারবার তার অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তার কষ্টকে তুচ্ছ করা হয়, তার কথা শোনার কেউ না থাকে, তবে ব্যক্তিগত মানসিক শক্তি যতই থাকুক না কেন, একসময় তা ভেঙে পড়তে পারে।

 

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে আত্মহত্যার প্রসঙ্গে ‘লজ্জা’ একটি বড় অনুষঙ্গ। মানসিক অসুস্থতা বা গভীর বিষণ্নতাকে এখনও অনেক পরিবারে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে একজন মানুষ যখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন, তখন তিনি সাহায্য চাইতেও ভয় পান। সমাজের চোখে তিনি যেন ব্যর্থ, অকৃতকার্য বা সমস্যাজনক। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই আত্মহত্যাকে আরও গভীরে ঠেলে দেয়। কারণ কষ্ট যদি বলা না যায়, আর বলা গেলে যদি তা গুরুত্ব না পায়, তবে মানুষ একা হয়ে পড়ে, একা এবং নিঃশব্দ।

 

শিক্ষা ব্যবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা, পরীক্ষার চাপ, তুলনামূলক সাফল্যের সংস্কৃতি; এসব তরুণদের মনে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ‘ভালো না করলে’ জীবনের মূল্য নেই বলে মনে হতে থাকে। ব্যর্থতা শেখার সুযোগ না হয়ে হয়ে ওঠে চরম লজ্জার কারণ। এই চাপের ভেতর যারা মানিয়ে নিতে পারে না, তাদের জন্য সমাজে বিকল্প কোনো নিরাপদ জায়গা প্রায় নেই। ফলে আত্মহত্যা তখন অনেকের কাছে শেষ মুক্তির পথ বলে মনে হয়, যা আসলে মুক্তি নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

 

কর্মক্ষেত্রেও আত্মহত্যার সামাজিক মাত্রা স্পষ্ট। বেকারত্ব, অনিশ্চিত চাকরি, কম মজুরি, অতিরিক্ত কাজের চাপ, হয়রানি; এসব বিষয় একজন মানুষের আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যখন একজন মানুষ দিনের পর দিন শ্রম দেয়, কিন্তু স্বীকৃতি পায় না, নিরাপত্তা পায় না, ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারে না, তখন তার ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা জন্ম নেয়। এই শূন্যতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ফল, যা মানুষের শ্রমকে মূল্য না দিয়ে তাকে যন্ত্রে পরিণত করে।

 

নারী ও সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার সামাজিক কারণ আরও জটিল। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, যৌন হয়রানি; এসবের ভার অনেক সময় একা একজন মানুষই বহন করেন। সমাজ যখন এসব অন্যায়কে পারিবারিক বিষয় বা ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে এড়িয়ে যায়, তখন ভুক্তভোগীর সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। আত্মহত্যা তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে; নীরব, চূড়ান্ত এবং ভয়াবহ।

 

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার খবর যদি দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে, সংবেদনশীলতা ছাড়াই পরিবেশন করা হয়, তবে তা অনুকরণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং সমস্যার সামাজিক শিকড় আড়াল করে দেয়। আবার একই সঙ্গে গণমাধ্যম চাইলে আত্মহত্যাকে কেবল সংবাদ হিসেবে না দেখে সামাজিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কারণ, প্রেক্ষাপট ছাড়া কোনো মৃত্যু বোঝা যায় না।

 

তবে এটাও সত্য, আত্মহত্যার মধ্যে ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা; এসব বাস্তব এবং চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। কিন্তু এগুলোকে যদি শুধু ব্যক্তির ভেতরের অসুস্থতা বলে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে সমাজ নিজের দায় এড়িয়ে যায়। প্রশ্নটি তাই ব্যক্তিগত না সামাজিক, এই দ্বৈততার মধ্যে আটকে নেই; বরং আত্মহত্যা হলো ব্যক্তিগত কষ্টের সামাজিক পরিণতি। ব্যক্তি ভোগে, কিন্তু সেই ভোগের পরিবেশ তৈরি করে সমাজই।

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধ মানে কেবল কাউকে মরতে না দেওয়া নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ কথা বলতে পারে, ব্যর্থ হতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে বিনা লজ্জায়। যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সহমর্মিতা চর্চা করা হয় এবং জীবনের মূল্যকে সাফল্যের একক মানদণ্ডে মাপা হয় না। যতদিন আমরা আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তির সমস্যা বলে দেখব, ততদিন সমাজ তার দায় এড়িয়ে যাবে। আর সেই এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে আরও অনেক নীরব বিদায়।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!