বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১৮ বার

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন

 

সময়টা ১৯২৪ সাল। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত এই উপমহাদেশ। বাংলার সাহসী বিপ্লবী সন্তানেরা তখন পরাধীনতার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সেই সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট বিপ্লবী নেতা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ—যিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, ছিলেন দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দেশবন্ধু তখন স্বরাজ দলের মুখপাত্র। ১৯২৪ সালের ১৪ জুন, শনিবার তিনি কলকাতার হরিতকী বাগান লেনের বাসভবনে সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান।

পরাধীন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে সেদিন তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে দেশবন্ধু আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর আন্দোলনের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। যাদের ওপর তিনি ভরসা করেন, অনেকেই পরে বিশ্বাসঘাতকতা করে। দেশবন্ধুর এই হতাশার উত্তরে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একটি গভীর সত্য উচ্চারণ করেন—“সবার আগে মানুষ তৈরি করতে হবে। কেননা মানুষের মধ্যে যদি মানুষের বৈশিষ্ট্য না থাকে, তাহলে সকল বিজয়ই অপূর্ণ থেকে যায়।”

এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে একটি গভীর জীবনদর্শন। সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতার যে কোনো বড় অর্জনের মূল ভিত্তি হলো মানুষ। মানুষ যদি মানবিক গুণে সমৃদ্ধ না হয়, তবে বাহ্যিক সাফল্য যত বড়ই হোক না কেন, তা কখনোই পূর্ণতা পায় না। তাই আজকের সময়েও এই কথাটি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন।

আমরা প্রায়ই গর্ব করে বলি, মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত ও বুদ্ধিমান প্রাণী। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে মানুষ আজ এমন অনেক কিছু অর্জন করেছে, যা একসময় ছিল কল্পনাতীত। আকাশে উড়ছে, সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান করছে, এমনকি মহাকাশেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। কিন্তু এত উন্নতির মাঝেও একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে ফিরে আসে—আমরা কি সত্যিই মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি?

প্রকৃত মানুষ হওয়া মানে কেবল মনুষ্য শরীর ধারণ করা নয়। একজন মানুষ তখনই সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে, যখন তার মধ্যে মানবিকতা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ বিকশিত হয়। অন্যের দুঃখে ব্যথিত হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করা—এসবই একজন প্রকৃত মানুষের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের সমাজে এসব মানবিক গুণের চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে।

আমরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর এক যুগে বসবাস করছি। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও দ্রুত করে দিয়েছে। যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিনির্ভরতার একটি অদৃশ্য নেতিবাচক দিকও রয়েছে। মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সময় কমে গেছে, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার অভ্যাসও আগের মতো নেই। ফলে মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সমাজে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার দিকে তাকালেও এই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবাদপত্র খুললেই আমরা দুর্নীতি, প্রতারণা, সহিংসতা, ধর্ষণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর দেখতে পাই। অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য মানুষ অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। কোথাও দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ, কোথাও সামাজিক অবিচার—এসব ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে, আমরা কি সত্যিই মানুষের মতো আচরণ করছি? প্রকৃত মানুষ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সততা ও নৈতিকতা। একজন মানুষ যখন নিজের দায়িত্ব সৎভাবে পালন করে, সত্যকে ধারণ করে এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, তখনই সে সমাজে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যখন মানুষ স্বার্থের কাছে নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়, তখন সমাজে অবিশ্বাস, বিভেদ ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

এই ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারই মানুষের প্রথম শিক্ষাঙ্গণ। ছোটবেলা থেকেই শিশু তার বাবা-মা ও বড়দের আচরণ দেখে জীবনবোধ শিখে। যদি পরিবারে সততা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার চর্চা থাকে, তাহলে সেই শিশুও বড় হয়ে একজন মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি পরিবারে সময়ের অভাব, অবহেলা বা মূল্যবোধের সংকট থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও সেই সংকট প্রতিফলিত হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কেবল তথ্য বা জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এটি মানুষের চরিত্র গঠনের অন্যতম মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার দিকে মনোযোগী করলে চলবে না, তাদের মধ্যে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে তুলতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। এ ছাড়া সমাজে আদর্শ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও খুব প্রয়োজন। ইতিহাসে আমরা অনেক মহান মানুষের কথা জানি, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে মানবতার উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাদের আদর্শ নতুন প্রজন্মকে সৎ ও মানবিক হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু যদি সমাজে অনৈতিকতা ও দুর্নীতির ঘটনা বেশি দেখা যায়, তাহলে তরুণদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়। তাই সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের আচরণেও সততা ও নৈতিকতার প্রতিফলন থাকা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ হওয়ার শিক্ষা আমাদের প্রত্যেকের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। আমরা যদি নিজের জীবনে সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের চর্চা করি, তাহলে সমাজেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ছোট ছোট মানবিক আচরণ—অন্যকে সাহায্য করা, সত্য কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা—এসবই একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

“মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন”—এই উক্তিটি শুধু কবিতার ছন্দে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানব সভ্যতার প্রতি এক গভীর আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সভ্যতার প্রকৃত মূল্য প্রযুক্তিগত উন্নতিতে নয়; বরং মানুষের মানবিকতা ও নৈতিকতার বিকাশে। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক মানুষের—যারা অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং সমাজের কল্যাণে দায়িত্ব পালন করতে পারে। আমরা যদি সেই পথে এগোতে পারি, তাহলেই আমাদের সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক ও সুন্দর হয়ে উঠবে। তাই কবি কুসুমকুমারী দাশ-এর উক্তিটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক—

“সাদা প্রাণে হাসি মুখে কর এই পণ,

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন।”

 

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!