শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বাস্থ্যবীমা: বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৪১ বার

স্বাস্থ্যবীমা: বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি

হঠাৎ গভীর রাতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো, যথারীতি চিকিৎসাও শুরু হলো। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা না যেতেই সামনে এলো এমন এক বিল, যা পরিবারের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি। শুরু হলো কঠিন সিদ্ধান্ত—চিকিৎসা চালানো হবে, নাকি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখা হবে? এই দৃশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়; বরং নীরব এক সামাজিক বাস্তবতা। তাই প্রশ্নটি স্পষ্ট—এই দেশে কি কেউ কেবল অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে?

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৩–৭৪ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। অর্থাৎ অসুস্থ হওয়া মানেই সরাসরি আর্থিক ধাক্কা। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে প্রতি বছর বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। একটি বড় অপারেশনেই একটি পরিবারের সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। ফলে চিকিৎসা এখন শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

এই ঝুঁকির বিপরীতে স্বাস্থ্যবীমা একটি কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশে এর চিত্র অত্যন্ত দুর্বল। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশের মাত্র ১ শতাংশেরও কম মানুষ স্বাস্থ্যবীমার আওতায়। যেখানে উন্নত বিশ্বে এটি প্রায় সর্বজনীন, সেখানে বাংলাদেশে এখনো সীমিত এবং অনেকের কাছে “উচ্চবিত্তের সুবিধা” হিসেবে বিবেচিত। অথচ বাস্তবে এটি হওয়া উচিত সকল নাগরিকের মৌলিক সুরক্ষা।

উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। জার্মানি ও ফ্রান্সে সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে নাগরিক ও নিয়োগকর্তা উভয়ই অবদান রাখেন। যুক্তরাজ্যে করভিত্তিক জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) চালু আছে, যেখানে নাগরিকরা বড় আর্থিক চাপ ছাড়াই চিকিৎসা পান। এই ব্যবস্থাগুলোর মূল দর্শন—চিকিৎসা মানুষের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে না।

বাংলাদেশে বাস্তবতা ভিন্ন। কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা সুরক্ষা দিলেও বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত—দিনমজুর, কৃষক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—এখনো এর বাইরে। ফলে যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই সবচেয়ে কম সুরক্ষিত।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবীমা কেন সময়ের দাবি তা স্পষ্ট। দেশে হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসার, কিডনি রোগসহ বহু জটিল অসংক্রামক রোগ বাড়ছে, যেগুলোর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে অনেকে সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না বা মাঝপথে বন্ধ করে দেন, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়। স্বাস্থ্যবীমা থাকলে মানুষ আর্থিক ভয় ছাড়াই চিকিৎসা নিতে পারে এবং রোগ জটিল হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

স্বাস্থ্যবীমা কার্যকর করতে হলে বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রয়োজন। প্রথমত, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাইক্রো-ইন্স্যুরেন্স চালু করতে হবে, যাতে স্বল্প প্রিমিয়ামে তারা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পুরো প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে গ্রামাঞ্চলের মানুষও সহজে বীমা নিতে ও সুবিধা পেতে পারে। তৃতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক সর্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা (UHC) চালু করা যেতে পারে, যেখানে উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি অবদান রাখবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষ ভর্তুকি পাবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থার সংকট। জটিল শর্ত, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার অভাবে অনেকেই বীমার প্রতি আস্থা হারায়। তাই পলিসি সহজ করা, দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত ও স্বচ্ছ করা জরুরি। আস্থা ছাড়া কোনো বীমা ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না। অতএব, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যবীমা অপরিহার্য। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি মানবিক অঙ্গীকার এবং সময়ের অপরিহার্য দাবি।

 

 

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!