সর্পদংশন: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
সাপে কামড়: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
https://epaper.bd-bulletin.com/share.php?q=2026/06/03/4/details/4_r4_c2.jpg
বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই বন্যা, জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি আরেকটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি সামনে আসে—সাপে কামড়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, হাওরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও কৃষিনির্ভর জনপদে এ সমস্যা বেশি প্রকট । মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, দিনমজুর কিংবা রাতে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ প্রায়ই সাপে কামড়ের শিকার হন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সাপের বিষের চেয়েও ভয়, কুসংস্কার, চিকিৎসায় বিলম্ব ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাই বড় বিপদের ঝুঁকি তৈরী করে। আমাদের সমাজে এখনও একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—সাপে কামড় মানেই মৃত্যু। অথচ বাস্তবতা হলো, সব সাপ বিষধর নয়; আবার বিষধর সাপ কামড়ালেও দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তাই সাপে কামড়ের ঘটনায় আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপে কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে প্রায় ১৮–২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং বছরে আনুমানিক ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই ঝুঁকির অন্যতম কেন্দ্র। কৃষিশ্রমিক, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, জেলে ও শিশুরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বর্ষাকালে সাপে কামড়ের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে পরিবেশগত কারণ রয়েছে। অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা মানুষের বসতবাড়ি, রান্নাঘর, খড়ের গাদা কিংবা আশপাশের ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ফলে মানুষ ও সাপের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা হঠাৎ বেড়ে যায়। অসচেতনতা ও অসতর্ক চলাফেরা এই ঝুঁকি ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাপে কামড়ের পর অনেক মানুষের ভুল প্রতিক্রিয়া। এখনও বহু মানুষ হাসপাতালে না গিয়ে ওঝা, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক বা লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। কেউ ক্ষতস্থান কেটে রক্ত বের করেন, কেউ শক্ত করে কাপড় বা দড়ি বেঁধে দেন, আবার কেউ সিনেমার মতন বিষ মুখ দিয়ে টেনে বের করার চেষ্টা করেন। এসব পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই; বরং অনেক সময় এগুলো রোগীর অবস্থা আরও জটিল করে তোলে। অনেকক্ষেত্রে সাপে কামড়ানো ব্যক্তির মৃত্যু অব্দি ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কামড়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া। আতঙ্কিত হলে হৃদস্পন্দন বাড়ে, ফলে বিষ শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত অঙ্গকে যতটা সম্ভব স্থির রাখা উচিত। কোনোভাবেই ক্ষতস্থান কাটাছেঁড়া, অপ্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ কিংবা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক রোগীর শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করেন, যা বিষধর সাপের কামড়ের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানেই সামনে আসে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা। দেশের অনেক উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে এখনও পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষিত জনবল সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই বিলম্ব কখনও কখনও জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে। তাই জরুরি ভিত্তিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম মজুদ রাখা, চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাপে কামড়ের চিকিৎসার সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গভীরভাবে জড়িত। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হলেও রোগীর যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও হাসপাতালে অবস্থানের খরচ দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে ব্যয় কয়েক হাজার টাকায় পৌঁছায়, যা সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে অনেক পরিবার দেরিতে চিকিৎসা নেয় কিংবা বিকল্প অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই সাপে কামড়ের চিকিৎসাকে সহজলভ্য, কার্যকর ও স্বল্পব্যয়ী করা বড্ড জরুরী। তবে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাতে বাইরে বের হলে টর্চ ব্যবহার, মাঠে কাজের সময় বুট বা মোটা জুতা পরা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ঝোপঝাড় ও আবর্জনা জমতে না দেওয়া, খড় বা কাঠের স্তূপে হাত দেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া—এসব ছোট ছোট অভ্যাস বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। একই সঙ্গে স্কুল, গণমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—সাপ প্রকৃতির শত্রু নয়; বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অকৃত্তিম বন্ধু। ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সব সাপ দেখলেই নির্বিচারে হত্যা করা কোনো টেকসই সমাধান নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপে কামড়কে “Neglected Tropical Disease” বা অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ এটি শুধু চিকিৎসাগত সমস্যা নয়; বরং দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। তাই নীতিনির্ধারণ, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ ও জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সাপে কামড় মানেই মৃত্যু নয়। ভয় নয়, সচেতনতা; কুসংস্কার নয়, সঠিক চিকিৎসা—এই মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলেই বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
