শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বাদের মোহে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ পাঠ: ২৩ বার

স্বাদের মোহে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি

https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-05-18&page=4&news=04_101

ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি ইত্যাদি মুখরোচক খাবারগুলো বাংলাদেশের শহুরে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিকেলের আড্ডা, স্কুল-কলেজ শেষে ঘোরাঘুরি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্তে এসব রাস্তার খাবার যেন স্বাদের এক অনন্য আনন্দের সঞ্চার করে। টক, ঝাল ও মিষ্টির মিশেলে তৈরি এই খাবারগুলো শুধু পেটই ভরায় না, বর্তমানে সামাজিকতারও একটি অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই স্বাদের মোহের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের প্রায় প্রতিটি অলিগলি ও ব্যস্ত মোড়ে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ির দোকান সহজেই চোখে পড়ে। খোলা পরিবেশে তৈরি এসব খাবার ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পানির সংস্পর্শে আসে। স্বাদের আকর্ষণ ও তুলনামূলক কম দামের কারণে ভোক্তারা খাবারের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। ফলে অজান্তেই আমরা এমন কিছু খাবার গ্রহণ করছি, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সায়েন্সেস’ এবং ‘ফুড মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রার ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে চটপটিতে বিপুল পরিমাণ E. coli ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ঝালমুড়ি, ছোলা-মুড়ি এবং অন্যান্য জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডেও লক্ষাধিক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এমনকি আখের জুস, মৌসুমি ফলের জুস ও অ্যালোভেরা শরবতের মতো পানীয়েও জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা সাধারণত স্বাস্থ্যকর মনে করা হলেও বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ফুচকার টক পানি ও অন্যান্য রাস্তার খাবারে মলজনিত জীবাণু (Faecal coliform) পাওয়া যায়, যা মূলত অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার এবং অপরিচ্ছন্ন হাতের মাধ্যমে ছড়ায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব জীবাণুর কিছু অংশ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ ওষুধেও অনেক সময় সংক্রমণ নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এর যৌথ জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিক্রেতা খাবার পরিবেশনের আগে হাত পরিষ্কার করেন না। টাকা নেওয়ার পর সেই হাত দিয়েই আবার খাবার তৈরি বা পরিবেশন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন পানি ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি রাস্তার ধুলাবালি ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকে আসা ভারী ধাতু—যেমন সিসা ও ক্যাডমিয়াম—খাবারে মিশে যেতে পারে, যা বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস A-এর মতো রোগের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় সাধারণ পেটব্যথা বা জ্বরকে আমরা হালকাভাবে নিই, অথচ এর পেছনে থাকতে পারে খাদ্যজনিত গুরুতর সংক্রমণ। বিশেষ করে শিশু, কিশোর ও বয়স্করা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার। ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত স্ট্রিট ফুডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানবদেহের জন্য নিরাপদ নয়। তবুও তরুণ প্রজন্ম আড্ডা ও অভ্যাসের অংশ হিসেবে প্রতিদিন এসব খাবার গ্রহণ করছে, যা অজান্তেই তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে হেপাটাইটিস A ও E ভাইরাস ছড়াতে পারে, যা লিভারে সংক্রমণ ঘটিয়ে জন্ডিস সৃষ্টি করে। তবে সব ধরনের জন্ডিস খাবার থেকেই হয় না; অনেক ক্ষেত্রে এটি লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, রক্তের সমস্যা কিংবা পিত্তনালির জটিলতার কারণেও হতে পারে। তাই অস্বাস্থ্যকর খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। এই সমস্যার পেছনে শুধু বিক্রেতাদের অসচেতনতা নয়, ভোক্তাদের উদাসীনতাও বড় ভূমিকা রাখে। আমরা অনেক সময় স্বাদের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হই যে খাবারের পরিচ্ছন্নতা বা উৎস সম্পর্কে খোঁজ নিতে ভুলে যাই। আবার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নজরদারির অভাবে অনেক বিক্রেতাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন না। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই একটি ঝুঁকিপূর্ণ চক্রে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিধি প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং নিয়মিত খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শন কার্যকর করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি খাবার বেছে নিতে পারে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন হয়ে উঠবে। তাই এখনই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধির চর্চাই পারে আমাদের প্রিয় খাবারগুলোকে নিরাপদ ও উপভোগ্য রাখতে।

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!