বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

প্রাথমিক শিক্ষা: অবহেলার বৃত্তে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১২১ বার

প্রাথমিক শিক্ষা: অবহেলার বৃত্তে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তির ওপর। এই স্তরেই একটি শিশুর ভাষা, চিন্তা, যুক্তি ও মূল্যবোধের বিকাশের সূচনা হয়। অথচ বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আজও কাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট এবং শিখন ঘাটতির এক জটিলতায় আবদ্ধ। ফলে ভর্তি ও পাসের হার বাড়লেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ! এই সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় “লার্নিং পভার্টি” বা শেখার দারিদ্র্যে। World Bank ও UNICEF-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫৮ শতাংশ একটি সাধারণ অনুচ্ছেদ পড়ে বুঝতে পারে না। তারা বিদ্যালয়ে যায়, পরীক্ষা দেয় এবং পাসও করে—কিন্তু পাঠবোধ তৈরি হয় না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা কাগজে-কলমে সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
এই দুর্বলতার পেছনে মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা একটি বড় কারণ। UNESCO-এর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং (GEM) রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্বল মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত দক্ষতা অর্জন ছাড়াই পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। ফলে শেখার ঘাটতি এক স্তর থেকে আরেক স্তরে বহন হয়ে গিয়ে মাধ্যমিকে আরও প্রকট হয়।
শিক্ষকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অনেক শিক্ষক আধুনিক পেডাগোজি (শিখন পদ্ধতি), সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারে পর্যাপ্ত দক্ষ নন। বিশেষ করে প্রাথমিক বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয় সহজভাবে উপস্থাপন করতে না পারায় শিক্ষার্থীদের শেখার গতি কমে যাচ্ছে।
এই সংকটকে আরও তীব্র করছে শিক্ষকদের ওপর আর্থিক ও পেশাগত চাপ। World Bank-এর তথ্যমতে, মালদ্বীপে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের গড় বেতন প্রায় ৯৫৩ ডলার হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ১৭০ ডলারের কাছাকাছি। এই বৈষম্য পেশার মর্যাদা ও মেধাবী জনবল আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (NAPE) ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ডিপিএড কোর্স চালু থাকলেও অর্জিত জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ হয় না। পাশাপাশি নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের অভাবও প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ। Campaign for Popular Education (CAMPE)-এর এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্ট অনুযায়ী, অনেক শিক্ষক পাঠদানের পাশাপাশি আদমশুমারি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও উপবৃত্তি সংক্রান্ত কাজে যুক্ত থাকেন। এতে শ্রেণিকক্ষে তাদের সময় ও মনোযোগ কমে যায়, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৩০–৪০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যকর। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে বাধা সৃষ্টি করছে, ফলে শহর-গ্রামের বৈষম্য বাড়ছে।
শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের ঘাটতিও উদ্বেগজনক। Centre for Policy Dialogue (CPD)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশেরও কম ব্যয় করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন।
বিদ্যালয়ের পরিবেশও অনেক ক্ষেত্রে অনুকূল নয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বহুমাত্রিক সংকটের প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর পড়ছে। দুর্বল ভিত্তি নিয়ে তারা মাধ্যমিকে প্রবেশ করলে পাঠ্যবিষয় কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে আগ্রহ কমে যায় এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। এতে একটি বড় অংশ অদক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ঘরোয়া পরিবেশও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্য ও অভিভাবকের অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু ঘরে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ পায় না। প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি বেশি, কারণ তাদের শেখার প্রক্রিয়ায় পারিবারিক সহায়তা সীমিত থাকে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়ের মধ্যে অবকাঠামো ও শিক্ষকের দক্ষতায় প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা কোচিং সুবিধা পেলেও গ্রামের শিশুরা বঞ্চিত হয়, ফলে বৈষম্য বাড়ে।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর তার সুগঠন শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা হতেই। তাই এটি কোনো সাধারণ খাত নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে উন্নয়নের অর্জন ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—শিক্ষক প্রশিক্ষণ উন্নয়ন, বেতন কাঠামো সংস্কার, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন। নাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মৌলিক শিক্ষা থেকেই পিছিয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে পুরো জাতির অগ্রগতিতে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!