ঈদুল আজহায় প্রাণীদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার গুরুত্ব
ঈদুল আজহা আসন্ন। মহাসমারোহে কুরবানির প্রাণী কেনাবেচা চলছে। এসময় আমরা যেন ইসলামে পশুপাখিদের প্রতি ইনসাফের শিক্ষা ভুলে না যাই। প্রাণীদের অনেক মানুষ নির্বোধ মনে করলেও যারা পশুপাখিদের সাথে উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন তারা জানেন যে তারা আসলে সবই বোঝে। তাই তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর কুরবানির ঈদের সময় প্রাণীর প্রতি অনেক রকম নিষ্ঠুরতা হতে দেখা যায়। তীব্র গরম আবহাওয়ায় বাসের সংকীর্ণ লাগেজ কম্পার্টমেন্ট থেকে জীবন্ত ছাগলদের টেনেহিঁচড়ে বের করার ছবিটা পত্রিকা পড়েন এরকম অনেকেই দেখে থাকবেন। এটি শুধু একটি উদাহরণ। আরও নানারকম নির্দয় পদ্ধতিতে প্রাণীদের পরিবহন করা হয়ে থাকে।
পরিবহনের পর আসে কুরবানি পর্যন্ত লালনপালন। অনেক জায়গায় দেখা যায় কুরবানির কিছুদিন আগে থেকেই প্রাণীটিকে বাড়িতে এনে রাখা হয়। অপরিচিত জায়গায় এসে সে ভয় পায়, মন খারাপ করে। তার করুণ চিৎকারে এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু যারা সেই প্রাণীটিকে ক্রয় করেছে, তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ থাকে না। তারা না প্রাণীটিকে ভালো কোনো জায়গায় রাখে, না তার যথাযথ যত্নআত্তি করে। ফলে সে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করে যায়।
প্রাণীদের এহেন কষ্ট দেয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। নবীজি একদিন এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট ছিল যে তাঁকে দেখা মাত্র কাঁদতে শুরু করলো। তিনি তার কানের পেছনে হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “এই উটের মালিক কে?” এক আনসারি যুবক এগিয়ে এসে বললো, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, এটি আমার।” নবীজি বললেন, “আল্লাহ যে প্রাণীটি তোমার অধীনে দিয়েছেন, তার ব্যাপারে কি তুমি আল্লাহকে ভয় করো না? সে আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে তুমি তাকে অভুক্ত রাখো এবং অতিরিক্ত খাটাও।” (আবু দাউদ) এই হাদীস থেকে পশুপাখিদেরও যে অনুভূতি আছে আর তাদের ব্যাপারেও যে আমাদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত সেটা পরিষ্কার।
পরিবহন, বাড়িতে রাখা থেকে শুরু করে কুরবানি পর্যন্ত সকল ধাপেই প্রাণীদের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। অনেকে কুরবানির প্রাণীর সামনেই তাকে জবাইয়ের অস্ত্র প্রস্তুত করে। কখনো কখনো আবার এক প্রাণীর চোখের সামনে আরেক প্রাণীকে জবাই করা হয়। এতে যেই প্রাণীটিকে এখনও জবাই করা হয়নি, সে-ও যারপরনাই ভয় পায়। আমাদের সামনে আরেকজন মানুষকে হত্যা করা হলে আমরা যে ভয় অনুভব করতাম, সেই একই ভয় যে তারাও পায় তা তাদের আর্তনাদ শুনলেই কারও বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়।
এই কাজ শুধু মানবতাবিবর্জিতই নয়, ইসলামবিরোধীও। হাদীসে আমরা দেখতে পাই, এক ব্যক্তি ছাগলের সামনে ছুরি ধার দিচ্ছিলো। এই দৃশ্য দেখে নবীজি খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “তুমি কি তাকে দু’বার মারতে চাও? ছাগলকে শোয়ানোর আগে কেন তুমি ছুরি ধার করোনি?” (বায়হাকি) আরেক হাদীসে তিনি এক ছাগলের চোখের সামনে আরেক ছাগলকে জবাই করতে নিষেধ করেছেন। (তাবারানি) এ থেকে আমরা বুঝতে পারি প্রাণীকে মৃত্যুর আগেই মৃত্যুভয় ভোগ করিয়ে মানসিক কষ্ট দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশনা, “নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে সর্বোত্তম আচরণ ফরজ করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করো, উত্তমভাবে হত্যা করো। এবং যখন জবাই করো, উত্তমভাবে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন ছুরি ধার করে নেয় এবং যবেহকৃত পশুকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়।” (মুসলিম)
অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রাণীকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে ধরাশায়ী করা হয় যাতে সে নিদারুণ কষ্ট ও ভয় পায়। আবার জবাইয়ের পর কাটা স্থানটিতে বারবার খোঁচায় কেউ কেউ। অথচ কুরবানির পরও কিছুক্ষণ প্রাণীটির মধ্যে জীবন থাকে কাজেই এসময় আঘাত দিলে সে কষ্ট অনুভব করে! এ ধরণের কাজ ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জীবিত অবস্থায় কোনো প্রাণীর অঙ্গ কাটা বা জবাইকৃত প্রাণীর দেহ ঠান্ডা হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানোকে ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (ফাতাওয়া ইবনে কুদামা) তাই এরূপ কাজ থেকে সবার বিরত থাকা দরকার।
অনেককে কুরবানির প্রাণীদের নিয়ে নানারকম হাসিঠাট্টা করতে দেখা যায়। এই ধরণের কাজ থেকেও আমাদের বিরত থাকা উচিত। যেই প্রাণীটিকে কিছুদিন পর কুরবান করা হবে, তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার বদলে তাকে নিয়ে মজা করা হৃদয়হীনতার পরিচয়। তাছাড়া এ ধরণের কাজের মাধ্যমে কি ইসলামের বিধানকেই হাসিঠাট্টার বস্তু বানানো হয় না? কাজেই এরূপ আচরণ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টিকামী প্রতিটি মানুষের বিরত থাকা ও রাখা কর্তব্য।
অমানব প্রাণীদের স্রষ্টা আর আমাদের স্রষ্টা একই। তারাও আমাদের মতোই অনুভূতিসম্পন্ন এক একটি সম্প্রদায়। তারাও আল্লাহর ইবাদত করে। আল্লাহ বলেছেন, “পৃথিবীতে বিচরণকারী সকল প্রাণী এবং দুই ডানায় উড়ে বেড়ানো পাখি সবাই তোমাদের মতোই এক একটি সম্প্রদায়।” (সূরা আল আন’আম) তাই এই প্রাণীদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি লালন করা প্রয়োজন।
কুরবানি আল্লাহর জন্য। তাই এই কাজটি করার পথে আমরা যেন আল্লাহরই সৃষ্টির উপরে অত্যাচার না করি সেদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সৃষ্টিকে কষ্ট দিলে স্রষ্টা নিশ্চয়ই খুশি হবেন না। এমনও হতে পারে যে সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে করার পরও শুধু অবলা প্রাণীদের সাথে নির্দয় আচরণের ফলস্বরূপ আল্লাহ তার কুরবানি কবুল তো করলেনই না, উল্টো তাকে শাস্তি দিলেন। আর তাছাড়া যা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন, সেইসব কাজ করার পরে নিশ্চয়ই এই আশা করা যায় না যে আল্লাহ তার ইবাদত কবুল করবেন।
পশুপাখিরা জড়বস্তু নয়। তাদেরও আমাদের মতো মায়ামমতা, ক্ষুৎপিপাসা, ভয়, অস্বস্তির অনুভূতি আছে। পার্থক্য হলো আমরা নিজেদের এই অনুভূতিগুলোর কথা বলতে পারি, তারা পারে না। কিন্তু তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে, চিৎকারে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ঠিকই সেগুলো প্রকাশ পায়। তাদের কান্না আর কেউ না শুনলেও আল্লাহ ঠিকই শোনেন। তাই আসুন, আমরা আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করি এবং তাদের সাথে সর্বক্ষেত্রে সদয় আচরণ করি।