নাম ও নারীর অদৃশ্য হওয়ার গল্প
“নারীরা আর আড়ালে থাকবে না। আমরা অদৃশ্য হয়ে থাকবো না। আমাদের নাম আছে।” – জ্যানেল মোনে
নাম—আপাতদৃষ্টিতে খুবই ছোট একটা ব্যাপার। কিন্তু এই ছোট্ট জিনিসটিই আমাদের প্রাথমিক পরিচয়। সমাজে আমরা সবার আগে পরিচিত হই আমাদের নাম দিয়েই। আর তাই এর গুরুত্বকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কার নাম প্রকাশ করা হচ্ছে, কীভাবে করা হচ্ছে, কারটা গোপন বা উহ্য রাখা হচ্ছে—তা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে শুধু প্রকাশই নয়, সরাসরি প্রভাবিতও করে।
আমাদের সমাজের একটা চিরাচরিত নিয়ম হলো নারীর পরিচয় পুরুষের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া। পক্ষান্তরে পুরুষের পরিচয় স্বাধীন। বিয়ের আগে নারীর নামের সাথে থাকে পিতার পদবী, বিয়ের পর সেটা প্রতিস্থাপিত হয় স্বামীর পদবী দিয়ে। পুরুষের বেলায় কিন্তু তেমন নয়—তার নাম বিয়ের আগে যা ছিল, বিয়ের পরেও তা-ই থাকে। নারীর নামের আগে মিস নাকি মিসেস বসবে তা নিয়ে হাজারটা নিয়মনীতি থাকলেও পুরুষের মিস্টার সদা অপরিবর্তনীয়।
সন্তানের পরিচয়ও নির্ধারিত হয় পিতার দিক থেকে। যেই মা প্রতিটা মুহূর্ত কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভধারণ করেন, আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বাচ্চাকে জন্ম দেন, তার পদবীতে কখনো সেই সন্তান পরিচিত হয় না। আবার বিভিন্ন সার্টিফিকেটে পিতা বা স্বামীর নামের ঘর থাকে, কিন্তু মাতা বা স্ত্রীর নামের ঘর থাকাটা যেন অপ্রয়োজনীয়।
ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি এলাকায় কোন পুরুষ মারা গেলে তার নিজের নামটি বলা হয়। অথচ কোন নারী মারা গেলে অমুকের স্ত্রী, অমুকের মা, অমুকের কন্যা (যেখানে প্রতিটি অমুকই পুরুষ) বলে তার পরিচয় দেয়া হয়। অর্থাৎ জীবদ্দশায় তো বটেই, মৃত্যুর পরেও নারী তার নিজের নামে পরিচিত হন না। তার পরিচয় হয় সম্পূর্ণটাই পুরুষের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই রীতির কোন যৌক্তিকতা নেই। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের দেখায় যে পুরুষ নয়, বরং নারীর দ্বারা বংশের ধারা প্রবাহিত হয়। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ মা থেকে সন্তানে লিঙ্গনির্বিশেষে সঞ্চারিত হয়। তবে ছেলে সন্তান এটা পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত বহন করে না। এই কাজটা করে শুধু মেয়ে সন্তান। অর্থাৎ, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ শুধুই নারীদের মাধ্যমে বাহিত হয়। (Cambridge University, 1981)
এই মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা ২০০,০০০ বছর আগের একজন নারী পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। এই নারীকে বলা হয় মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ। তাঁর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ কন্যা থেকে কন্যায় বাহিত হয়ে বর্তমান পর্যন্ত পৌঁছেছে। (Oxford University, 2013)
পুরুষদের ক্ষেত্রে এমনটি নয়। হ্যাঁ, ছেলে সন্তানও মায়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ পায়। তবে সেটা তার থেকে তার সন্তানে সঞ্চারিত হয় না। যখন সে পিতা হয়, তখন তার সন্তান পায় মায়ের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ, পিতার নয়। অর্থাৎ বংশধারা নারীরাই বহন করে থাকেন, পুরুষরা নন।
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ’র মিউটেশন এতোই ধীরগতিতে হয় যে আজকের এবং ১০,০০০ বছর আগের একজন নারীর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ প্রায় একইরকম। তার মানে বংশের বাতি জ্বালিয়ে রাখার যে ব্যাপারটা, সেটা প্রকৃতপক্ষে করে থাকে নারীরাই। (Max Planck Institute, 2018)
অথচ আমাদের সমাজের রীতি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ উল্টো। কারণ পুরুষতন্ত্র একটা অপ্রাকৃতিক নিয়ম।
তবে প্রকৃতির কথা যদি বাদও দিই, তাহলে সামাজিকভাবেও এই প্রথার কোন যুক্তি নেই। সন্তান ধারণ ও পালনে সিংহভাগ পরিশ্রম মায়েরই থাকে। তাহলে কেন সন্তান শুধু পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবে? এটি কি মায়ের কষ্টকে অবজ্ঞা করা নয়? কেনই বা বিয়ের পর একজন নারীকে তার নাম, তথা তার পরিচয় বদলে ফেলতে হবে—যখন পুরুষের ক্ষেত্রে এমন কোন বিধিবিধান নেই? এর মাধ্যমে কি এই বার্তাই দেয়া হয় না যে নারী পুরুষের সম্পত্তি, স্বতন্ত্র মানুষ নয়?
নারী এবং তার সন্তানের পরিচয় একপাক্ষিকভাবে পুরুষের নামে হওয়ার ফলে আমাদের সমাজ থেকে নারীরা একপ্রকার হারিয়ে যান। অনেকের বাবার পরিচয় বা স্বামীর পরিচয় আমরা জানতে পারি, কিন্তু মা বা স্ত্রীর পরিচয় জানা হয় না। একটি বংশের ইতিহাস নির্ণয় করতে সারি সারি পুরুষের নাম খুঁজে বের করা হয়, কিন্তু ওই বংশকে টিকিয়ে রাখতে কোন অংশে কম অবদান না রাখা সত্ত্বেও (বরং অনেকাংশে বেশিই) নারীরা বেনামী হয়ে আড়ালেই থেকে যান। তাদের নাম ভুলে যাওয়া হয়, পদবী ভুলে যাওয়া হয়, তারা কোথা থেকে এসেছেন তা অজানা থেকে যায়। এতে করে নারীর সংগ্রাম স্বীকৃতি পায় না, তাকে মূল্যায়ন করা হয় না।
এর ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়—সমাজে নারীদের কম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। জন্ম থেকেই শিশুর প্রতি পরিবারের দুইচোখা মনোভাব প্রকাশ পায়। পুত্র সন্তান হলে তাকে ভাবা হয় বংশের প্রদীপ, পক্ষান্তরে কন্যা সন্তান হলে অনেকের মুখ কালো হয়ে যায় কারণ কন্যার মাধ্যমে তো বংশের নাম পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছবে না। ফলে শুরু হয় পুত্র সন্তানকে মাথায় তুলে রাখা, আর কন্যাকে দুচ্ছাই করা। এই বৈষম্যেরই চরম রূপ হলো কন্যা জন্ম দেয়ার “অপরাধে” মায়ের উপর নির্যাতন, কন্যাভ্রূণ নষ্ট করা, কন্যাসন্তানের প্রতি উদাসীনতা বা বৈষম্য ইত্যাদি।
অনেকে বলে থাকেন স্ত্রীর স্বামীর পদবী গ্রহণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সত্যিই যদি তা-ই হয়, তবে কেন এই “ভালোবাসা” একা নারীকেই প্রকাশ করতে হয়? কেন স্বামীরাও তাদের স্ত্রীদের পদবী গ্রহণ করে ভালোবাসা প্রকাশ করেন না? এটি স্পষ্ট বৈষম্য ব্যতীত কিছু নয়। কাজেই একে রোমান্টিসাইজ করার সুযোগ নেই।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর নাম গোপন করার চর্চা বন্ধ করা উচিত। কোন কোন ক্ষেত্রে নারীর নিজের নামের বদলে পুরুষের নাম বলা হচ্ছে তা আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং আলোচনা করতে হবে। নারীর পরিচয় পুরুষের নামে না দিয়ে তার নিজের নামেই দেয়ার অভ্যাস করতে হবে।
পাশাপাশি সবরকম সার্টিফিকেটে যেন পিতা/স্বামীর নামের পাশাপাশি মাতা/স্ত্রীর নামের স্থানও থাকে সেটি নিশ্চিত করা দরকার। ইতোমধ্যে এই নিয়ম থাকলেও কিছু কিছু সার্টিফিকেটে এখনও মাতার নামের ঘর থাকে না, শুধু পিতার নাম থাকে। এদিকে সরকার এবং সচেতন নাগরিকদের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন।
বিয়ের পরে নাম যদি পরিবর্তন করতেই হয়, তবে সেটা যেন একপাক্ষিক না হয়। বরং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে-অপরের পদবী গ্রহণ করতে পারেন, কিংবা চাইলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ পদবী অপরিবর্তিত রাখতে পারেন, সেরকম নিয়ম চালু করতে হবে। শিশু জন্মের পর তাকে শুধু পিতার পদবী না দিয়ে মাতার পদবী দেয়াও স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। এটা অনেকের কাছে অভাবনীয় মনে হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই এই চর্চা চলছে। বিয়ের পরে অনেক নারী তাদের পদবী পরিবর্তন করছেন না, অনেকে আবার সঙ্গীর পদবীর সাথে নিজের পদবী একীভূত করছেন। এতে করে পরিচয়ের বৈষম্য দূর হচ্ছে।
নাম আপাতদৃষ্টিতে খুব ছোট একটা ব্যাপার হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। নারীর পরিচয় যখন হয় পুরুষের সাথে তার সম্পর্কের ভিত্তিতে, তখন সমাজকে এই বার্তাই দেয়া হয় যে নারীর নিজের কোন পরিচয় নেই, সে স্বতন্ত্র ব্যক্তি নয় বরং পুরুষের সম্পত্তি। আবার মায়ের শত কষ্টের পরও যখন সন্তান শুধু পিতার নামেই পরিচিত হয়, তখন এই বার্তাই দেয়া হয় যে নারীর কষ্টের কোন গুরুত্ব নেই। এরূপ নিয়ম সমাজে লিঙ্গবৈষম্যকে পাকাপোক্ত করার পাশাপাশি নারীদেরও নিজেদের পরিচয় সম্বন্ধে হীনমন্য করে তোলে। তাই এই বৈষম্যমূলক নিয়ম পরিবর্তনে আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে সতর্ক হওয়া এখন একান্ত প্রয়োজন।