বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিপথগামী নেতা-কর্মীর দায় কার?

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৪৫ বার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশ এখন উত্তাল। সভ্য সমাজেও মানুষ পশুর চেয়েও ভয়ংকর অসভ্য হতে পারে তা ভাবতেই যেকোনো বিবেকবান ব্যক্তির গা শিউরে উঠবে। বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে আছে। সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হলো দেশের সেরা মেধাবীদের শিক্ষাঙ্গন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

ছাত্রলীগের কতিপয় বিপথগামী নেতা-কর্মীর বর্বরতার কাছে হেরে গেছে একটি তাজা প্রাণ। মৃত্যু ঘটেছে একটি পরিবারের স্বপ্নের, দেশ হারিয়েছে মেধাবী মানবসম্পদকে। কিন্তু কেন এই নির্মম হত্যাকান্ড? এ নিয়ে টিভি-টকশো, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরছেন। যে বিষয়কে কেন্দ্র করে মূলত ঘটনার সৃষ্টি তা হলো ফেসবুক স্ট্যাটাস। দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৯ নং ধারায় নিশ্চিত করা হয়েছে। আবরার হয়ত সেই অধিকার থেকেই সম্প্রতি ভারতের সাথে বাংলাদেশের হয়ে যাওয়া বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে নিজের মন্তব্য ফেসবুকে লিখেছিলেন। তারপর ছাত্রলীগের কতিপয় উচ্ছশৃঙ্খল নেতা-কর্মী আবরারকে শিবির সন্দেহে বিভিন্নভাবে জেরা করে এবং তার ফেসবুক প্রোফাইল ও মেসেঞ্জার চেক করে। পরে শিবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক ফ্যান পেজে লাইক দিয়ে রাখার অভিযোগে প্রায় ছয় ঘন্টা নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সকালে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়টি প্রচার করা হলেও পরে আবরারের ফেসবুক স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি থিতিয়ে আসে। এটি শুধুমাত্র বুয়েটে নয়; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটতেই আছে অহরহ। এর কোনোটি পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে; আবার অনেক ঘটনায় লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কিন্তু বিস্ময়কর প্রশ্নটি হচ্ছে, ছাত্রলীগকে এতো সুপার পাওয়ার দিয়েছে কে!

আবরার হত্যার ঘটনায় সকলের মনে বেশকিছু প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর ফেসবুক প্রোফাইল বা মেসেঞ্জার চেক করে জেরা করা অধিকার কোনো ছাত্রসংগঠনের রয়েছে কিনা? সন্দেহের বশঃবর্তী হয়ে অথবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীকে শিবির আখ্যায়িত করে কিংবা কেউ যদি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েও থাকে তবে সে কেন শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত এমন প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে কিনা বা তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেবার অধিকার কোনো ছাত্রসংগঠনের রয়েছে কিনা? কারণ দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক যতক্ষণ না রাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশে কাউকে নিষিদ্ধ করা না হয় বা আদালত কর্তৃক অপরাধীকে যেকোনো অবস্থায় দেখামাত্র হত্যা বা গুলি করে হত্যার নির্দেশ না দেওয়া হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।

আরেকটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই মিডিয়ায় বলছেন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজ নিজ টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, ব্যক্তির অপকর্মের দায় সংগঠন নিতে পারে না এবং নিবেও না, অপরাধীর কোনো দল নেই প্রভৃতি। এতে কেউ কেউ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন যে, কোনো কর্মীর ভালো কাজের ভাগ যদি পুরো সংগঠন নিতে পারে, তবে খারাপ কাজের দায় কেন নয়? আবার কেউ বলছেন রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় না থাকলে অন্য রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর উপরে কিভাবে চড়াও হতে পারে! কেউবা বলছেন, অপরাধী যদি কোনো সংগঠনের হয়, আর তার অপরাধকর্ম যদি ব্যক্তিস্বার্থ না হয়ে বিরোধীমতের প্রতি ঘৃণা বা দলীয় সিদ্ধান্তে আঘাত লাগানোর কারণে হয়ে থাকে, তবে তার দায় সংগঠনকেই নিতে হবে। কারণ সংগঠন তাকে দলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে বা কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আরেকটি নোংরা প্রথার প্রচলন আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতিতে প্রচলিত আছে। কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধকর্ম ঘটালেই প্রথমত অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। যদি তা সম্ভব না হয় তবে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নেতাকর্মীদের অপকর্মের জন্য শুধুমাত্র বহিষ্কার করেই কি দায় এড়াতে পারে কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে তর্ক-বিতর্ক চলছে। তাহলে প্রশ্নটি হচ্ছে, বিপথগামী কর্মীর দায় নেবে কে?

আমাদের দেশে শিক্ষাঙ্গনে হত্যার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বলা যায় যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বরাবরই ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের দৌরাত্ম রুখতে একপ্রকার ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র দল-ছাত্র শিবির কর্তৃক বিরোধীমতের (ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি) নেতাকর্মীদের নির্যাতন, হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিচারহীনতা যেন আমাদের দেশের একপ্রকার সংস্কৃতিতে রূপ হয়েছে। অপরাধী গ্রেফতার হয় ঠিকই, কিন্তু অজানা এক কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। হোক সেটি আইনের ফাকফোঁকর কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন জ্ঞানচর্চার চারণভূমি। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বিরোধীমত থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা বরাবরই সরকার কিংবা দলীয় কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মেনে নিতে পারেনা। সহনশীলতার রাজনীতিচর্চার অভাববোধ থেকেই এমন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিপক্ষের সাথে কারণে-অকারণে ক্যাম্পাসে বহু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থেকেছে দিনের পর দিন। এজন্য কখনও কখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির দাবিও উঠে আসে। এমন দাবি আসার কিছু কারণও রয়েছে। আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতি একপ্রকার খেই হারিয়ে ফেলেছে।

বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রদের সাধারণ মানুষ আদর্শহীন, চরিত্রহীন, অর্থলোভী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, অস্ত্রবাজ সর্বোপরি সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মানুষ হিসেবে মনে করে থাকেন। একসময় আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির একসময় অনেক সুনাম ছিল। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে বা কোন সংকটে কিংবা যেকোনো নায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা ছিল অতীব প্রশংসনীয়। কিন্তু এখন যেন সেই ঐতিহ্যবাহী ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের কান্সারে পরিণত হয়েছে।

৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদের পতন আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা আজও সোনালী অক্ষরে লিখা আছে। কিন্তু সেই সোনালি ইতিহাস যেন আজ মলিন হতে চলেছে।

‘নানা মানুষ, নানা মত’ এই চিরন্তন সত্য বাক্যটিকে অস্বীকার করার অধিকার কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতাদেরই নেই। প্রত্যেকে নিজ নিজ মত বা আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করবে এটি সকলের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সকল কিছুর উর্দ্ধে রাখতে হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও স্বার্থসংরক্ষণে কাজ, ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির পুরনো ঐতিহ্য ফিরে আসুক, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত হোক, অসুস্থ রাজনীতিকে সুস্থ করতে মেধাবীরা ফিরে আসুক ছাত্ররাজনীতিতে, ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃবৃন্দ গড়ে উঠুক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে এটিই সকলের কাম্য।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদ।
লিংক কপি হয়েছে!