ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে মুজিবনগর
(মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারেনা। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে গত ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ খ্রি. শুক্রবার মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে শিক্ষা সফরে গিয়েছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপের রোভার ও গার্ল-ইন রোভার সদস্যরা)
সকাল সাড়ে ৭ টায় শীতের মৃদু হিমেল হাওয়াতে ‘আমরা বিশ্বাসী আত্মমর্যাদায়, আমরা বিশ্বাসী বন্ধুতায়, সকল জীবের প্রতি আমরা সদয়’ স্কাউটের চিরচেনা গানটি বাজাতে বাজাতে মুক্তিযুদ্ধের অনন্য স্মৃতিময় স্থান মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরের উদ্দেশ্যে শিক্ষা সফরে যায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউটের সদস্যরা। অর্ধ-শতাধিক রোভার ও গার্ল-ইন রোভারের মধ্যে কারো কারো চোখে যেন তখনও ঘুমের আভা লেগেই আছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হইচই আর রোভার সদস্যদের গানে গানে উৎসবমুখর পরিবেশে সকলের ঘুম মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। ক্যাম্পাস থেকে বাস ছাড়ার পরে কুষ্টিয়া শহর থেকে আমাদের সাথে যোগ দেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক প্রফেসর ড. রুহুল কে এম সালেহ ও রোভার স্কাউট লিডার প্রফেসর ড. কামরুল হাসান। তাঁদের পেয়ে রোভার সদস্যদের আনন্দ যেন আরো বেড়ে গেল! বাড়বেই না বা কেন? উনারা যে আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে যেন সেই ছোট বেলায় হারিয়ে গিয়েছিলেন এবং সকলের আনন্দমাত্রাকে দ্বিগুণে বৃদ্ধি করেছিলেন। কামরুল স্যারের সুরেলা কন্ঠের গান আর সালেহ স্যারের দুষ্টু দুষ্টু জোকস বাসের ভেতরের পরিবেশকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল বহুগুণে। বেলা সাড়ে এগারটায় আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য স্থল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে। বাস থেকে নেমেই সকলকে একত্রিত করে কিছু দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিলেন আমাদের সাথে যাওয়া সম্পাদক স্যার। এরপর আমরা সকলে তৎকালীন বৈদ্যনাথ তলার বিভিন্ন স্মৃতিময় নিদর্শনগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। জানতে পারলাম বিশাল আম বাগানটির মালিক ছিলেন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত মেহেরপুরের ভবের পাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। তার নামানুসারেই দিনে দিনে জায়গাটির নাম হয়ে উঠে বেদ্যনাথ তলা। এই বাগানেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। শপথ গ্রহণ ও ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি বিবৃতি পাঠ করেন এবং বৈদ্যনাথ তলার নাম রাখেন মুজিবনগর। দেশের জন্য তাঁদের অমন জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের কথা ভাবতেই আমার গা শিহরিত হয়ে উঠছিল। তারপর একটু সামনে এগুতেই প্রথমেই চোখে পড়ল ২০.১০ একর জমির উপর নির্মিত ২৩ টি কংক্রিটের ত্রিকোণাকার স্তম্ভের সমন্বয়ে গঠিত স্মৃতিসৌধটি। ২৩ টি স্তম্ভ পাকিস্তানের ২৩ বছর শাসনের প্রতীক বহন করছে। স্থপতি তানভীর করিমের সকশায় এ সৌধটিকে উদীয়মান সূর্যের প্রতীক বলে মনে হয়। ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার ১৬০ ফুট ব্যাসে বেদীটি নির্মিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শহীদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিসৌধের মেঝেতে ৩০ লক্ষ পাথর বসানো হয়েছে। সৌধের ১১ টি সিঁড়ি মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে নির্দেশ করছে।
প্রায় ৮০ একর জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। আম্রকাননের জায়গার পরিমাণ প্রায় ৪০ একরের মতো। এখানে রয়েছে ১৩শ’টি আম গাছ। তিনটি ধাপে ছয় স্তর বিশিষ্ট দুইটি গোলাপের বাগান ৬ দফা আন্দোলনের প্রতীক বহন করছে। এখানে আছে বঙ্গবন্ধু তোরণ, অডিটরিয়াম, শেখ হাসিনা মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কেন্দ্র, মসজিদ, হেলপ্যাড, স্বাধীনতা মাঠ. স্বাধীনতা পাঠাগার, শিশুপল্লী ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র। স্মৃতিসৌধের পর এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল বাংলাদেশের মানচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভক্ত ১১ টি সেক্টরে ভাগ করে দেখানো হয়েছে এই নান্দনিক মানচিত্রটিতে। কমপ্লেক্সের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ভাস্কর্যসহ বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণসহ খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রায় ৪শ বিভিন্ন ভাস্কর্য।
এইসব ঘুরতে ঘুরতে কখন যে ২টা বেজে গেছে আমাদের খেয়ালই নেই। স্যারের পূর্ব নির্দেশনা মোতাবেক আমরা সকলে দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য সেই ঐতিহাসিক আম্রকাননে মিলিত হই। খাবার গ্রহণের পরে শুরু হয় বিভিন্নমূলক প্রতিযোগিতা। প্রথমেই ঐতিহাসিক মুজিবনগর সম্পর্কে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বালিশ খেলা, বেলুন ফুলানো, গান, অভিনয়ের পর শুরু হয় আমাদের সাথে যাওয়া তিনজন শিক্ষকের অঘোষিত প্রতিযোগিতা! প্রত্যেকেই যেন জোকস বলে রোভারদের হাসানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন! এরপর অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। স্মৃতিসৌধে যৌথ ছবি তোলার পরে আমাদের ফেরার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ফেরার কথা মনে পড়তেই সকলের যেন মুখটা মলিন হয়ে গেল। কিন্তু সকলেই নিরুপায়। সময় যে বড়ই নিষ্ঠুর। সে কারো জন্যই অপেক্ষা করেনা। ঠিক আমাদের জন্যও তা করেনি। সবকিছু গুছিয়ে আমাদের বাস ছুটে চললো ক্যাম্পাসের পথে। ফেরার পথে শুরু হয় র্যাফেল ড্র। প্রতিটি পুরস্কার ঘোষণার সাথে সাথে সকলের হৈ-চৈ আর করতালিতে মুখরিত হচ্ছিল বাসের ভেতরের পরিবেশ। সকলের সমস্বরে গান গাওয়ার সুরে সুরে ক্যাম্পাসের দিকে বাস ছুটে যাচ্ছিল দ্রুত গতিতে। রাত সাড়ে আটটায় আমরা ক্যাম্পাসে পৌঁছলাম। সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে তবুও যেন সকলের মুখে তৃপ্তির হাসি। প্রথমে মেয়েদেরকে ও পরে ছেলেদেরকে তাদের নিজ নিজ হলে পৌঁছে দেবার মাধ্যমে সমাপ্তি হল একটি শিক্ষা সফরের। মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারেনা।
