বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পদের জন্য রাজনীতি নাকি রাজনীতির জন্য পদ?

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৯ পাঠ: ৪১ বার

রাজনীতি শব্দটির ব্যাসবাক্য ‘নীতির রাজা’ হিসেবে অবহিত হয়ে থাকলেও বর্তমান কালে এটি নৈতিকতার যাদুঘরে স্থান পেতে চলেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এখন রাজনীতি মানেই যেন একটি আতঙ্কের নাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। হবেই না বা কেন! বিগত দিনের কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করলেই যে এটি স্পষ্ট হয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে পদ নিয়ে অন্তঃ-কোন্দলের খবর, দু-গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের খবর প্রায়ই পত্রিকার পাতায় শোভা পায়। প্রত্যেকেই যেন নিজের কর্তৃত্ব, ক্ষমতার বিস্তার আর প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখাতে চায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন সকলের সামনে ভেসে উঠছে, পদের জন্য রাজনীতি নাকি রাজনীতির জন্য পদ?
একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে। সেই সংগঠনের কর্মীদের মূল কাজটি বর্তায়, সেই আদর্শের প্রচারক হিসেবে। কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশের রাজনীতি সেই পথে চলছে কি না তার উত্তর প্রদান করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের সদস্যরা নিজেদের সেই দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে যতটা না স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তার থেকে নিজেকে নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি ভালোবাসেন। এজন্য আজ দেশে অনেক নেতা তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের উত্তরসূরী দেশে আজ তৈরি হচ্ছে না। কারণ তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক দলের আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করেছেন নিঃস্বার্থভাবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে। কখনও নিজের বা পরিবারের স্বার্থ চিন্তা করেননি। নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতরে থেকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণে কোনো কিছু না দেখে সবসময় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার মধ্যে রাজনীতি করেছেন। কখনও পদ কিংবা কোনো ব্যক্তিস্বার্থের সাথে রাজনীতিকে মেশাননি বলেই তাদের হাত ধরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং তারা দল, মত, আদর্শ নির্বিশেষে সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন।
একটি রাজনৈতিক দলে বিভিন্ন পদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য মূলত সেই দলের কার্যক্রমকে যথাযথ ও পরিপূর্ণরূপে সম্পাদন করা। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ যেন এখন একটি নেতা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে! শুধু তাই নয়; একটি রাজনৈতিক দলের সামান্য একটি ওয়ার্ডের কমিটিতে কোনো পদে থাকলেই যেন তার প্রভাব, ক্ষমতা, দম্ভ ও প্রতিপত্তিতে পুরো ওয়ার্ডের লোকজন প্রকম্পিত থাকে। নিজের দলের আদর্শের সঠিক জ্ঞান না থাকলেও তার নামে ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে যায় পুরো শহর। সে যেন এক মস্ত নেতা! নেতৃত্বগুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তি নিশ্চয়ই দেশ ও জাতির জন্য আশির্বাদস্বরূপ। কিন্তু বর্তমানে একটি প্রশ্ন সকলের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে যে, সমাজে সত্যিই কি যোগ্য নেতা তৈরি হচ্ছে?
‘আমি ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছি। কিন্তু কখনও পদের জন্য দল করিনি’- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই কথাটি দলীয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলে থাকেন। তিনি গত সপ্তাহেও একই কথা বঙ্গভবনে বলেছেন। এ থেকে অনুমান করা যেতেই পারে, তিনি মনে মনে আওয়ামী লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একটু হতাশ ও নাখোশ। কারণ সম্প্রতি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ঠ পরিস্থিতি সবাইকে নাড়া দিয়েছে। এছাড়াও আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী আসন্ন কাউন্সিল নিয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক হতে একটি বার্তা দিলেন সেটিও বলা যায়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কমিটি গঠন হলেই চারদিকে একটু উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দলটির জনপ্রিয়তা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই দলে কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার বেড়েছে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা। ফলে কমিটি ঘোষণার সময় প্রায়ই নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও সংঘর্ষ পত্রিকার শিরোনাম হতে দেখা যায়।
যত বড় না দেশ, তার থেকে যেন বেশি রাজনীতি আমরা চর্চা করি। ফলে আমাদের দেশের রাজনীতি প্রায়ই অরাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে থাকে। বর্তমানে রাজনৈতিক দল সমূহের নতুন কমিটি ঘোষণা মানেই যেন একটি আতঙ্ক ও ভয়ানক পরিস্থিতির উৎপত্তি হবে, এটিই যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ যেখানে নতুন নেতৃত্বকে নিমিষেই স্বাগত জানানোর কথা ছিল; উল্টো সেখানে মারামারি, হাতাহাতির ঘটনা অহরহ ঘটছে। পর্যালোচনা করলে এমনটি ঘটার বিভিন্ন কারণ পরিলক্ষিত হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের পদ-বাণিজ্য, আঞ্চলিকতা, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ হলো এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ। আমাদের দেশের নেতারা গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতি করেন বলে যেভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করেন, সেই অনুপাতে নিজেরা দলের ভেতর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতন্ত্রের কতটুকু চর্চা করেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন।
দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন কমিটি ঘোষণায় উত্তাপ একটু কম থাকলেও তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠিত হলে অধিকাংশ সময় থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আবার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ দলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও দু-গ্রুপের সংঘর্ষের খবর নেহায়েত কম নয়। অনেক সময় দলগুলোর স্থানীয় কমিটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল না মেটাতে পেরে কেন্দ্র কর্তৃক সেই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও একই কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবারও নজির আছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করা ঐতিহ্য থাকলেও বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে নেতাভিত্তিক রাজনীতি চর্চার ফলে পদের প্রতি লোভ বাড়ছে। অবিলম্বে এই সংস্কৃতি যদি বন্ধ করা না হয়, তবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই এটি বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে। সর্বোপরি এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে দূষিত করবে। বিশেষ করে দেশের ছাত্র সংগঠনগুলো নেতাভিত্তিক রাজনীতি চর্চার ফলে অধিকাংশ সময় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতি বিমুখ হয়েছে।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে পদের প্রতি এতো আকর্ষণ বাড়ছে কেন এবং কেনই প্রায় প্রতিটি স্থানে কমিটি ঘোষণা করার পরে ক্ষোভের সঞ্চার ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে- এই প্রশ্নের উত্তরটি খুঁজতে হয়ত খুব একটা বেগ পেতে হবে না। নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদি যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া না হয়, তবে ক্ষোভের সঞ্চার স্বাভাবিক বিষয়। পদ-বাণিজ্যের ফলে যখন মাদকাসক্ত ব্যক্তি, দাগী অপরাধী, এলাকার সন্ত্রাসী, আদর্শ সম্পর্কে কম জ্ঞাণসম্পর্ক ব্যক্তিকে যখন নেতা নির্বাচন করা হয় তখন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আবার পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বর্তমানে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি যত না চর্চা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে নেতাভিত্তিক। ফলে এক নেতা পদে অধিষ্ঠিত হলে অন্য নেতার অনুসারীরা সন্তুষ্ট হতে না পেরে বিক্ষোভ করেন; ফলাফল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। সমাজে প্রভাব বিস্তার করা, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও বিভিন্ন অনৈতিক উপায়ে অর্থ-উপার্জন সম্ভব বলেই পদের প্রতি এতোটা বেশি আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। সর্বোপরি পদে থাকলে সমাজে সগৌরবে নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া হলো রাজনীতিতে পদপ্রত্যাশার বিশেষ কারণ।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যারা নিঃস্বার্থ রাজনীতি করে গেছেন তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত উন্নয়ন হয়নি কিন্তু দল, মত, নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল। যখন এই নশ্বর পৃথিবী থেকে তারা বিদায় নেন, তখনও দেশবাসী তাঁর নাম স্মরণ করে থাকে শ্রদ্ধার সাথে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান যে অবস্থা, কয়েক দশক পরে বিভিন্ন কারণে প্রতিপক্ষ ও অন্তঃকোন্দলের ফলে রাজনীতি কতটা মাত্রায় দূষিত হয়ে পড়বে তা কল্পনা করলেই যে কারো গা শিউরে উঠবে। গতানুগতিক রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতি অবিলম্বে পরিবর্তন করে দেশ ও দশের কল্যাণে যত দ্রুত সুস্থ রাজনীতি চর্চা করা সম্ভব হবে, ততই আমাদের জন্য তা মঙ্গলজনক হয়ে উঠবে।

০৯.০৬.২০১৯

লেখক: প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ জুন ২০১৯ তারিখে দৈনিক জনতা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।