সর্বত্র ব্যথা, মলম দেব কোথা?
আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। কবির সেই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও দিতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে বলতেই হচ্ছে ‘আমরা যা বলি তা করিনা, যা করি তা বলিনা’। বর্তমানের পরিস্থিতি যেন সত্যিই তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নেতা দিনের বেলা বক্তৃতার মঞ্চে মেহনতি মানুষের পক্ষে গগনবিদারি কন্ঠে আওয়াজ তোলেন, রাতের বেলা তিনিই ত্রাণ সামগ্রী কিভাবে এদিক-সেদিক করা যাবে তার পরিকল্পনা করে থাকেন। টেলিভিশন, পত্রিকার সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক সম্প্রীতির কথা বললেও আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা কিভাবে প্রতিপক্ষকে কিভাবে হেনস্তা করা যায় তার কুটবুদ্ধি করেন। মাদকবিরোধী আন্দোলনের নেতারও যেন একটু মাদক সেবন করতেই হবে। নারীবাদী অনেক নেতার গৃহকর্মীও তার দ্বারাই নির্যাতনের খবরও পত্রিকার পাতায় শোভা পেয়েছে। আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের কথা-কাজের মিল ও সহনশীলতা গুণের খুব অভাব পরিলক্ষিত হয়। দেশে কখনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই তারা কোনও প্রমাণ ছাড়ায় ঐতিহ্যগতভাবে পরস্পরের প্রতি কাঁদা ছোঁড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশে কোনও সন্ত্রাসী হামলা হলে বিরোধিদল সরকারকে সহযোগিতার পরিবর্তে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে পদত্যাগ দাবি করে বসেন। আবার সরকারের থেকেও ভিন্ন আচরণ আমরা দেখতে পাইনা। দেশে খাদ্যে ভেজাল মহমারী আকারও ধারণ করলেও সরকারের এক দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তি একটি বক্তৃতা অনুষ্ঠানে বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বিএনপি-জামায়াতের কাজ। এইভাবে পরস্পরের দোষারোপের রাজনীতি আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্থ করে।
মানুষের অসুখ হলে ঔষধ খায়, শরীরের কোথাও ব্যথা পেলে মলম লাগায়। কিন্তু সমস্যা যদি শরীরের সবখানে দেখা দেয়, তবে মানবযন্ত্র ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একসময় সমস্ত অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকল হয়ে মানবদেহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অঙ্গপ্রতঙ্গ ধরে একটি দেশকে যদি মানবদেহের সাথে তুলনা করি, তবে সেটি অমূলক হবে না। আর যেভাবে দেশের সবখানে পচন ধরা শুরু করেছে, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া দেশটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবনার কারণ রয়েছে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা হাতে নিলেই লাল রংয়ের শিরোনাম চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, দূর্নীতি, ধর্ষণ কিংবা খুন। কিন্তু কেন? বাংলাদেশ এখন স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশে কোনও গৃহযুদ্ধ নেই। তবে প্রতিদিনই কেন মূল্যবান জীবন দিতে হচ্ছে সাধারণ সাধারণ নাগরিককে? সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েও মনের ভেতরে শান্তি থাকে না। না জানি কোন যানবাহনের চাকায় পিষ্ঠ হয়ে হারাতে হয় সোনার ময়নাটিকে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতেই বিগত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫ হাজার। বছরে গড়ে আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও দিনে দিনে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ৪৩৯ জন। সন্তানকে সাথে নিয়ে বিদ্যালয়ে যেয়েও যে খুব একটা স্বস্তি, তা বলছি না। কারণ দেশের একটি অপশক্তি ছেলেধরা নামক যে অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়েছে না জানি কখন কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হতে হয়! বাজারে যাবেন? সেখানেও যে আপনি নিরাপদ তা বলব না। কারণ খাদ্যসন্ত্রাসীদের ছোবলে প্রতিটি খাদ্যদ্রব্য কেনার আগে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়। কোমলমতি শিশুদের জন্য পাস্তরিত দুধ থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় মসলা, মাছ-মাংসসহ সব কিছুতেই ভেজালের প্রকোপ। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাবেন কিংবা ঔষধের দোকানে! ডাক্তারদের লাগামহীন রোগী দেখার ফী আর ফার্মেসীতে ঔষধের মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দেখে আপনার অসুখ হয়ত আরেকটু বাড়লেও বাড়তে পারে। মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ যে আপনাকে দেওয়া হবে না, তারও নিশ্চয়তা আপনাকে দিতে পারি না। আপনার সন্তানকে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। স্বপ্ন আপনার ছেলে অনেক বড় হবে। কিন্তু দূষিত রাজনীতির যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আপনার সন্তান যে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে তারই নিশ্চয়তায় বা দিবে? স্কুল-মাদরাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপনার মেয়ে সম্ভ্রম নিয়ে ফিরে আসতে পারবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষাগুরু যারা কিনা আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের দ্বারাই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দূর্নীতির থাবাতেও দেশের সাধারণ মানুষ জর্জরিত। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি উদাহরণমাত্র। এছাড়াও দেখা যায়, ১০ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার আগেই অন্যদিকের বেহাল দশা হতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে আপনি সরকারি কোনও অফিসে সেবা নিতে গেছেন? নির্ধারিত সেবা ফি নেবার পূর্বেই আপনাকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ঘুষ যে আপনাকে নিতেই হবে। পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, বিদুৎ অফিসসহ অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান আজ ঘুষের থাবায় জর্জরিত। এমনকি সরকারি চাকুরি শেষে অবসরের সময় নিজের পেনশন নিতেও দিতে হয় সেই কথিত স্পিডমানি। যদি গ্রামের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই প্রায় একই অবস্থা। রিলিফের কার্ড পাবার জন্যও সুনজরে থাকা চাই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার। সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পেলাম, গরীব-মিসকিনদের অধিকার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়েও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে হয়েছে দেশের মানুষকে। কিন্তু আমাদের দেশের অতীত ইতিহাস বলছে, এসব সিন্ডিকেটকারীরা অজানা কোনো কারণে বিচারের আওতামুক্ত থেকে যায়।
অপরাধপ্রবণতার বেশকিছু কারণ গবেষণায় উঠে এসেছে। এরমধ্যে বিচারহীনতা একটি কারণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেকোনও অপরাধকর্মকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে থাকে। আমাদের দেশে এই সংস্কৃতি বহুলভাবে প্রচলিত। দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, নিজ দলের কোনও কর্মীর বিচার হলে মনে করে যে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এইভাবে অধিকাংশ অপরাধী রাজনৈতিক ছায়াতলে আশ্রয় পাওয়ায় অন্যান্যরা সেই অপরাধের প্রতি আরও উৎসাহিত হয়। আবার বিচারে যথাযথ প্রমাণের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতাও বিচার পাবার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। আবার দেশের বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে করেছে নানা রকমের সিন্ডিকেট। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আমরা দেখতে পেয়েছি, খোদ সরকারেরই এক নেতাকে নীরবে আন্দোলন বানচালের বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে। এইভাবে সিন্ডিকেটের কবলে দেশ জিম্মি থাকার ফলে সংস্কারমূলক কার্যক্রম সরকার হাতে নিলেও তা বেশিদূর এগুতে পারেনা। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়াও অপরাধপ্রবণতার অন্যতম একটি কারণ। অসাধু আইনজীবীরা শুধুমাত্র আর্থিক দিক বিবেচনা করে আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোঁকর খুঁজে বের করে অপরাধীদেরর রক্ষায় ব্রত হন। এতে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আবার একই কর্মকান্ড করে থাকে।
একটি বিষয় প্রত্যেকের মাথায় রাখতে হবে। দেশটা আমাদের সকলের। দেশের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমেই আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। দল, মত, গোষ্ঠী নির্বিশেষে যদি আমরা একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলি, তবে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ আমাদের রয়েছে যথেষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদ, সর্বোপরি রয়েছে কর্মক্ষম মানবসম্পদ। সুষ্ঠু ও সুষম কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমেই আমাদের দেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। ‘সে ভালো, তুমি ভালো, কিন্তু আমি আরও ভালো হতে চাই’ এই নীতিতে যতদিন না আমরা এগুতে পারব, ততদিন আমরা স্বজাতির ভেতরেই বিভাজনের ভেতরেই রয়ে যাব।
