বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ধর্ষণের উৎস কি-অবক্ষয়, বিচারহীনতা, নাকি দৃষ্টিভঙ্গি?

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৫ পাঠ: ৮৫ বার

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সবাদপত্রের পাতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন নতুন কোনো না কোনো ধর্ষণের খবর দেখা যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামড়কোনো জায়গাই এই পাশবিকতা থেকে মুক্ত নয়। শিশু, কিশোরী, তরুণী, বৃদ্ধা এমনকি গর্ভবতী নারীরাও রক্ষা পাচ্ছেন না ধর্ষকদের হাত থেকে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। বিচারহীনতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, এবং লালসার অন্ধত্বের কারণে ধর্ষণ একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে।

ধর্ষণের মূল কারণ বিচারহীনতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা বিচারের মুখ দেখেনি। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে শাস্তি হয় না বা দেরিতে হয়। ফলে অপরাধীরা মনে করে, তারা যা খুশি করতে পারে, তাদের কিছুই হবে না। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ধর্ষণের পেছনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো চিহ্নিত না করা। ধর্ষণের কারণ হিসেবে অনেকে নারীদের পোশাক, চলাফেরা বা মিডিয়ায় নারীদের উপস্থাপনাকে দায়ী করেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষণের পেছনে প্রধান কারণ হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীর প্রতি সম্মানের অভাব, এবং বিকৃত মানসিকতা।

নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ফ্যাশন, বিনোদন ও বিজ্ঞাপন শিল্পে নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা অনেকের দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদাকে ক্ষুণণ করে। বিজ্ঞাপনে নারীদের আবেদনময়ীভাবে উপস্থাপন, সিনেমায় “আইটেম সং” এবং বিভিন্ন বিনোদন মাধ্যম নারীর সৌন্দর্যকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে। এর ফলে সমাজে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে, এবং তাদের একটি ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটিও সত্য যে, কেবলমাত্র মিডিয়ায় নারীর উপস্থিতি ধর্ষণের একমাত্র কারণ নয়।

নারীর পোশাক ও চলাফেরার ওপর দায় চাপিয়ে ধর্ষণের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ধর্ষণের জন্য সম্পূর্ণভাবে ধর্ষক দায়ী। সমাজে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা ও তাদের মানসিকতা সংশোধন করাই মূল সমাধান। নারীর পোশাক যত শালীনই হোক, যদি পুরুষদের লালসার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হয়, তবে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।

ধর্ষণের হার কমাতে হলে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। সমাজে একজন পুরুষ কীভাবে নারীকে দেখে, তার উপর নির্ভর করে সে নারীকে কতটা সম্মান করবে। ছোটবেলা থেকেই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।ইসলাম ধর্মসহ সব ধর্ম নারীদের সম্মান করতে বলেছে। ইসলাম বিশেষভাবে পুরুষদের দৃষ্টি সংযত করতে বলেছে। পুরুষরা যদি সত্যিকার অর্থে নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে, তাহলে নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে। কিন্তু বর্তমান সমাজে পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা পুরুষদের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে দেবে না। কেননা, পুরুষের লালসার সুযোগ নিয়ে কসমেটিকস, ফ্যাশন, বিনোদন ও বিজ্ঞাপন শিল্প কোটি কোটি টাকা আয় করে। এই ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নারী স্বাধীনতার নামে নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। একজন নারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের সৌন্দর্য ও শরীরকে উপস্থাপন করে ব্যবসায়িক লাভের চেষ্টা করেন, তাহলে এটি পুরো নারী সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর ফলে সমাজে নারীদের মর্যাদার অবনতি হয় এবং পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিকৃত হতে পারে। তবে এটি বলার মানে এই নয় যে, ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক দায়ী। ধর্ষণের একমাত্র কারণ ধর্ষকের বিকৃত মানসিকতা এবং সমাজের বিচারহীনতা। কিন্তু নারীরা যদি নিজেদের সম্মান বজায় রাখেন এবং নিজেদের পণ্য হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ না দেন, তাহলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও বদলাতে পারে। ধর্ষণ প্রতিরোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:

দ্রুত ও কঠোর বিচার ব্যবস্থা: ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা প্রয়োজন। শাস্তির হার বাড়ানো গেলে অপরাধের প্রবণতা কমবে।নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নৈতিক শিক্ষা: শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে।

ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বয়কট: ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: মিডিয়ায় নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে তাদের ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলীর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন: ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। পরিবার ও সমাজের ভূমিকা: পরিবারের ভেতরেই নারীর প্রতি সম্মান ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিতে হবে। ধর্ষণ একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি, যা বিচা-রহীনতা, নৈতিক অবক্ষয় ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মহামারী আকার ধারণ করেছে। শুধু আইন কঠোর করলেই এই ব্যাধি দূর হবে না: প্রয়োজন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, নারীদেরও নিজেদের মর্যাদা বজায় রাখতে সচেতন হতে হবে। মিডিয়া, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে সমাজে ধর্ষণের শিকড় নির্মূল করা যায়। সমাজে ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে শুধু আইন বা শাস্তি নয়, বরং নৈতিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও অপরিহার্য।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!