বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া ভবিষ্যৎ কি?

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৪ পাঠ: ৫৮ বার

গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মোহাম্মদ ইয়ামিন। মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বাসায় বসে আছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নানান পরিকল্পনা। নানা ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে যাচ্ছে তার উদাসিনী মন। কোন সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারছে না। কখনো চিন্তা করে সে ডাক্তার হবে কখনো চিন্তা করেছে ইঞ্জিনিয়ার হবে আবার কখনো চিন্তা করে সে অনেক বড় অফিসার হবে, এভাবেই কাটতেছে তার দিনগুলো। একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয় তাকে অনেক বড় অফিসার হতে হবে। বড় কোন অফিসার হতে হলে তাকে সবার আগে ভালো কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে হবে। তার জন্য সে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করল।

গ্রামের মা বাবার ধারণা ছেলে বা মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করছে এখন তাকে ভালো কোন চাকরি করতেই হবে। কিভাবে ছেলে বা মেয়েকে ভালো একটা চাকরিতে যোগদান করিয়ে দেওয়া যায় এই নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তিত থাকেন বাবা-মা।

একদিন ইয়ামিনের বাবার সাথে পরিচয় হয় হুমায়ুন সাহেবর সাথে। সরকারি অফিসের বড় একজন কর্মকর্তা হুমায়ুন সাহেব। একই গ্রামের হওয়াই হুমায়ুন সাহেবকে ইয়ামিনের বাবা ইয়ামিনকে একটা চাকরি ব্যবস্তা করে দেওয়ার কথা বলেন। হুমায়ুন সাহেব ইয়ামিনের খোজ খরব নিয়ে তাকে চাকরি দিবেন বলে কথা দেন। এভাবে অনেক দিন কেটে যায় নয়ন সাহেবের কোন খোজ খবর নাই। ইয়ামিন বিশ্ববিদ্যালয় পরিক্ষা দেওয়া শুরু করে কিন্তু কোথায় ও চান্স না পেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিষয় নিয়ে অনার্স শুরু করে। ভালোই যাচ্ছিল ইয়ামিনের দিন। কিন্তু এইদিকে তার বাবা তাকে নিয়ে চিন্তা থাকেন সারাক্ষণ কি করে তাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিবেন। ছেলের ভবিষ্যৎ কি করে উজ্জ্বল করবেন তা নিয়ে ভাবতে থাকেন শুধু।

কয়েক মাস পর হঠাৎ একদিন হুমায়ুন সাহেবের কল আসে ইয়ামিনের বাবার ফোনে। ইয়ামিনের বাবাকে জানান সরকারি অফিসে ভালো একটা চাকরি আছে। ওনি চাইলে এই চাকরিটা ইয়ামিনকে দিতে পারেন। এটা শুনে ইয়ামিনের বাবা তো অনেকে খুশি ছেলে চাকরি করবে সরকারি অফিসে। ছেলের ভবিষ্যৎ একটা নিশ্চিয়তা চলে থাকবে। কিন্তু তিনি জানেন না তার ছেলের জীবনে কি ঘোর অন্ধকারের দিকে তিনি নিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক দিন পর ইয়ামিন ঢাকাতে এসে পরিক্ষা দিয়ে গেল। পরিক্ষার পর জানানো হলো সে পরিক্ষায় পাস করছে কিন্তু কিছু টাকা হলে চাকরি হয়ে যাবে। ইয়ামিনের বাবা গ্রামের সহজ সরল মানুষ তিনি মনে করেন সরকারি অফিসে চাকরি করতে হলে কিছু টাকা লাগতে পারে তাই তিনি কিছু মনে না করে কত টাকা লাগবে জানতে চাইলেন। হুমায়ুন সাহেব বললেন তেমন বেশি না মাত্র দুই লক্ষ টাকা হলে হয়ে যাবে। হুমায়ুন সাহেবের কাছে দুই লক্ষ টাকা মাত্র হলেও গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের ইয়ামিনের বাবার কাছে সারাজীবন দুই লক্ষ টাকা এক করা স্বপ্ন। তিনি হুমায়ুন সাহেবকে কথা দিয়েছেন তিনি যে করেই হোক টাকা জোগাড় করে দিবেন।

বাড়ি এসে ছেলে ইয়ামিন ও তার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করেলেন কি করা যায়। এত টাকা এক সাথ করা তাদের কাছে চারটি কানি কথা নয়। তাদের শেষ সম্বল বলতে ঘর ভিটার জমি আর হালের দুইটি গরুই আছে। ইয়ামিনের বাবা জানালেন হালের গরু দুইটি বিক্রি করে ছেলেকে চাকরিতে দিবেন। ছেলে ভালো থাকলে, ইনকাম করলে তাদের একসময় সব কিছু হবে। দুইটি গরু বিক্রি করে বাকি টাকা ঋণ করে হুমায়ুন সাহেবকে টাকাটা দিয়ে ছেলের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। ছেলে ইয়ামিন চাকরি জয়েন করে ভালোই টাকা দিচ্ছেন বাড়িতে। খুব সুন্দর কাটতে লাগলো ইয়ামিনের ও তার পরিবারে জীবন।

এক দিন অফিস থেকে একটা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হলো। সবাই ট্রেনিং এ উপস্থিত হলেন। কয়েকটি সেশন নেওয়ার পর আসলো আউটসোর্সিং এর উপর সেশন। এই প্রথম ইয়ামিন আউটসোর্সিং এর ধারনা পায়। আউটসোর্সিং কি? আউটসোর্সিং চাকরির ভবিষ্যৎ কি?আউটসোর্সিং চাকরির মেয়াদ কি রকম ইত্যাদি অনেক বিষয় জানতে পারে। সে বুজতে পারে তাকে হুমায়ুন সাহেব ঠকিয়েছেন প্রতারণা করে। তার এই চাকরি স্থায়ী নয়। প্রকল্প যতদিন আছে ততদিন। এমন কি যে কোন কর্মকর্তা চাইলে যখন তখন তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। ইয়ামিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বাবাকে কি করে বললবে যে এত টাকা দিয়ে সে যে চাকরি করে তার কোন নিশ্চিয়তা নেই। এইভাবে হতাশাগ্রস্ত জীবন পার করতে থাকা ইয়ামিন।

আউটসোর্সিং আসলে কিঃ আউটসোর্সিং হলো মূলত অন্যের মাধ্যমে কাজ করিয়ে টাকা ইনকাম করা। সককারি অফিসে আউটসোর্সিং বলতে বুজায় কোন এটা সিকিউরিটি কোম্পানির সাথে চুক্তি হয় সরকারের, যারা সারকাকে কম বেতনে সল্প সুবিধাতে কর্মচারি সংগ্রহ করে দেয় এর বিপরীতে তারা কমিশন পায়। কিন্তু আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো যদি তাদের কমিশন নেওয়া পর্যন্তক সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে মধ্যেবিত্ত পরিবারগুলোর এই হতাশাগ্রস্ত জীবন দেখতে হতো না। আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়ার নাম করে প্রতিটি পরিবার থেকে দুই লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্তক নিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে এই টাকা তুলতে তুলতে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এতে করে ইয়ামিনের মত সবাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পরে। শুধু ইয়ামিন না ইয়ামিনের মত হাজারো পরিবারে স্বপ্ন নষ্ট হচ্ছে এই আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হওয়া নিউজ চোখে পরে হরহামেশাই। গত পহেলা মার্চ মাসের দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার একটা শিরোনাম হয় ৯ মাসের বেতন না পেয়ে মানবতার জীবন পার করছে আউটসোসিং কর্মচারীরা। মাঝে মাঝে এ নিয়ে আন্দোলন হলেও কোন সুফল পাওয়া যায় না। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের যদি সরাসরি প্রকল্পে নিয়োগ দেয় তাহলে কোন কোম্পানিকে টাকা দেওয়া লাগবে না এতে করে চাকরি চলে গেলেও তাদের ঋণের ভয় থাকবে না। জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগতে হবে না। তাছাড়া আউটসোর্সিং চাকরিতে স্থায়ী হওয়ার নিয়ম না থাকায় অনেকে চকরি করতে করতে বয়স শেষ হয়ে যায় পরে আর সরকারি চাকরি করতে পারে না।

ইয়ামিনের মত তরুণরা আমাদের দেশের সম্পদ। আমরা যদি তারুণ্যে এই শক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারি তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে আসবে। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগাতে হবে প্রথমে। তাহলেই আমরা গড়ে তুলতে পারবো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকৃত সোনার বাংলাদেশ। ইয়ামিন যদি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরিতে আসতে তাহলে বাংলাদেশ ওকে সম্পদ হিসেবে পেত। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যখন ইয়ামিন চাকরি হারা থাকবে তখন সে পরিবারের জন্য যেমন ভোজা হয়ে থাকবে তেমনি দেশের জন্য ও ভোজা হয়ে থাকবে।

না আছে তার শিক্ষার সার্টিফিকেট না আছে কোন কাজের দক্ষতা। না আছে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা।

এখনি সময় সরকারের আউটসোর্সিং প্রক্রিয়া সঠিক একটি সমাধান খুঁজে বের করা। দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে রক্ষা করতে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কোম্পানির সাথে চুক্তি প্রক্রিয়া বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি। কোম্পানির সাথে চুক্তি না করে সরাসরি প্রকল্পে জনবল নিয়োগ দিলে হয়তো ইয়েমিনের মতন সর্বহারা হতে হবে না হাজারো তরুণকে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৪ মার্চ ২০২৪ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!