বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গ্রামীণ জীবনে লাইব্রেরির ভূমিকা

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ পাঠ: ৬২ বার

শম্ভুপুর গ্রামের জান্নাত বেগম অল্প শিক্ষিত একজন মহিলা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় আল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়াই তাই আর পড়াশোনা করতে পারেনি। তার অনেক ইচ্ছা থাকলেও বিয়ের পর গ্রামে কোনো ভালো সুযোগ না থাকায় তার আর পড়াশোনা হয় না। তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে করেই হোক তার ছেলে বা মেয়েকে তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। বিয়ের তিন বছর পর তার কোলজুড়ে একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান আসে। তিনি তার নাম রাখলেন বিজয়। তার ধারনা বিজয় নামের ছেলেরা কখনো হারে না। হারতে জানে না। ছেলে বিজয় ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে মা জান্নাত বেগমের মনের ইচ্ছাও দিন দিন প্রবল হচ্ছে। ছেলের চার বছর বয়স থেকে নিজেরে লালিত স্বপ্নের কথা মাথায় রেখে নিজেই নিজের ছেলেকে পড়াশোনা শুরু করলেন। ছেলে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে মা তার সন্তানকে পড়াচ্ছেন। এখন ছেলে অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর জান্নাত বেগম তার মনের ইচ্ছার কথা তার ছেলে বিজয়কে বললেন তিনি আরো বলেন সে যেন ভালো করে পড়াশোনা করে এবং দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যাতে সে পড়াশোনা করে। ছেলে এই বয়সে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা না থাকলেও তার মায়ের ইচ্ছের মূল্য তার কাছে অনেক বেশি।

পড়াশোনায় মনোযোগী হয় এসএসসি এবং এইচএসসি তে ভালো রেজাল্ট নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। এখন তার স্বপ্ন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে কোন একটাতে পড়া। কিন্তু বিপত্তিটা এখানে ঘটে। শহরে তার পরিচিত কোন লোকজন নেয় যার কাছে থেকে সে ভর্তি পরিক্ষার জন্য কোচিং করবে।

শহরে কোচিং করা সেটা বিজয়ের সামর্থের ও বাহিরে। গ্রাম অঞ্চলেও তেমন কোনো ভালো কোচিং সেন্টার নেই যেখান থেকে সে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে পারে। এমনকি গ্রামে ইন্টারনেট ব্যবস্থাও উন্নত না যে সেখান থেকে সে অনলাইনের মাধ্যমে কোচিং করবে। তখন সে কোন কিছু না পেয়ে গ্রামে খোঁজ করতে থাকে একটা লাইব্রেরী যেখান থেকে সে সকল ধরনের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কিন্তু সে আবিষ্কার করে তার ইউনিয়ান এমনকি তার উপজেলা তো একটি উন্মুক্ত লাইব্রেরি নেই। বিজয় তখন একটা লাইব্রেরীর খুব প্রয়োজন অনুভব করে। যেখান থেকে সে নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। অর্জন করতে পারবে তার ভর্তি পরীক্ষার জন্য সমস্ত জ্ঞান।লাইব্রেরি মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা। এটি জ্ঞানের ভাণ্ডার, সংশোধনের শক্তি এবং সম্প্রদায়ের একটি অগ্রণী অংশ। লাইব্রেরি বই, ম্যাগাজিন, জার্নাল, ডেটাবেস, ইলেকট্রনিক রিসোর্স ইত্যাদি সরবরাহ করে যা সমাজের সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি শিক্ষা, অনুসন্ধান, নীতি নির্ধারণ, বিচার, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এটি নতুন ধারণা আবিষ্কার করা, পুরনো ধারণার সংশোধন, প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশ্ব সংগ্রহের সাথে মানবিক যোগাযোগ ও সংবাদ প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনে বৃদ্ধি এনে দেয়। এটি শিক্ষা ও সংশোধনের প্রধান উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষের ব্যক্তিত্ব উন্নত করে এবং সমাজে নতুন ধারণা এবং নীতিগুলির মাধ্যমে প্রগতি হয়।

বিশেষত লাইব্রেরিতে ভালো বই পেতে গিয়ে মানুষের জীবনে একটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লাইব্রেরি না থাকলে আমরা অন্ধকারের মধ্যে থাকতাম, নতুন ধারাবাহিক বা নতুন প্রযুক্তির প্রতি ধারণা অর্জন করা সম্ভব হতো না। আমরা লাইব্রেরির মাধ্যমে নতুন ধারাবাহিক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, বিশ্বব্যাপী প্রবন্ধ, গবেষণা ইত্যাদির প্রতি আগ্রহ ও জ্ঞান অর্জন করি। এটি আমাদের চিন্তার দৃষ্টিতে একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান যা আমাদের সংস্কৃতি, জ্ঞান, ও সমৃদ্ধ ধারাবাহিক সামগ্রী প্রদান করে।

মানুষের জীবনে লাইব্রেরির অপরিহার্য গুরুত্ব রয়েছে। এটি জ্ঞানের সম্মানিত ভাণ্ডার, সংস্কৃতির সংরক্ষণশীল অংশ, এবং আত্মসমৃদ্ধির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। লাইব্রেরির মাধ্যমে আমরা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারি, বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারি এবং নিজেদের জীবনে নতুন দিক দেখতে পারি।

লাইব্রেরির অবদান সম্পর্কে বিভিন্ন দেশে বিবিধ সাংবাদিক এবং বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদন করেছেন এবং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের একটি মূল উপায় হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। লাইব্রেরি আমাদের জীবনে এত গুরুত্ব বহন করলো বিজয়ের উপজেলার মতো বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা উপজেলাতেই নেই উন্মুক্ত লাইব্রেরী যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। নিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার জন্য প্রস্তুতি ও। তারা পারছে না একাডেমির বাইরে কোন জ্ঞান অর্জন করতে।

বাংদেশের গ্রন্থগার অধিদপ্তরের অধীনে মোট ৭১ টি পাবলিক লাইব্রেরি ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি মালিকানায় দুই হাজারের ও বেশি লাইব্রেরি থাকলেও সবার জন্য তা উন্মুক্ত নয়। বিজয়ের মতই প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই উন্মুক্ত লাইব্রেরী না থাকার কারণে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বঙ্গ হচ্ছে। বিজয়ের মায়ের মত শত শত মায়ের ইচ্ছা আশা আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হচ্ছে। যথার্থ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠন ব্যতীত আমাদের পরিপূর্ণ মুক্তি বা সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। বইবিমুখ সৃজনশীলতা বিবর্জিত একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এমন প্রজন্ম পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবার জন্যই অকল্যাণকর। যা অবশেষে সবার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বই ছেড়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন নানা অকাজ-কুকাজে লিপ্ত তাদের পর্যাপ্ত সেইরকম সুযোগ না করে দেওয়ার কারণ। অথচ বিপুল সংখ্যক এ প্রজন্ম নিয়ে যেন ভাবার কেউ নেই! তরুণ প্রজন্মই দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। তরুণ প্রজন্মের সঠিক পরিচর্যা ও তাদের বেড়ে ওঠার ওপর নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।লাইব্রেরি আমাদের আলোর পথের নীরব পথপ্রদর্শক। সমৃদ্ধ জাতি গঠনে গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির বিকল্প নেই।জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য গ্রন্থাগারগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। প্রজন্মকে বইপড়ায় জ্ঞানচর্চায় মুক্তচিন্তায় উৎসাহিত করতে হবে এবং তার জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি উপজেলাতে একটি মডেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে অবকাঠামোগত অনেক ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে, আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নও ঘটেছে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি ও মননশীলতার কি সে ধরনের কোনো উন্নয়ন হয়েছে? ওভাবে হয়ে ওঠেনি বলেই আমাদের আজ এই করুণ দশা। অথচ সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মননশীলতার উন্নয়ন ব্যতীত জাতির সমৃদ্ধি ও পরিপূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয়।

লাইব্রেরি আমাদের বাতিঘর। আমরা আমাদের বাতিঘরকে হারাতে বসেছি বিধায় আমাদের আজ এই করুণ দশা। আমাদের সমৃদ্ধির পথে এগোতে হলে, একটি সৃজনশীল প্রজন্ম ও মননশীল জাতি গড়ে তুলতে হলে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি এর কার্যকারিতায় আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা চাই না বিজয় ও তার মায়ের মত আর কোন মা ছেলের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে যাক।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে দৈনিক আজকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!