বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের গর্ব

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পাঠ: ৩২ বার

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ততকালীন বঙ্গের টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। সেখানকার “বসাক” সম্প্রদায়ের তাঁতিরা টাঙ্গাইল শাড়ি বুনতেন। টাঙ্গাইল শাড়ির এই তাঁতিরা ছিল ঐতিহ্যবাহী মসলিন তাঁতশিল্পীদের বংশধর। তাদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার ধামরাই ও চৌহাট্টায়। তারা দেলদুয়ার, সন্তোষ ও ঘ্রিন্দা এলাকার জমিদারদের আমন্ত্রণে টাঙ্গাইল যায় এবং পরবর্তীতে সেখানে বসবাস শুরু করে। শুরুতে তারা নকশাবিহীন কাপড় তৈরী করত।

টাঙ্গাইল শাড়ি বুননের সাথে তাঁতি পরিবারের প্রতিটি সদস্য জড়িত থাকত। কোনও কারিগর বা শ্রমিক নিয়োগ করা হত না, যা ছিল বয়ন কৌশলকে তাঁতি পরিবারের বাইরে যেতে না দেওয়ার রীতি। বসাক পরিবারগুলি ছিল টাঙ্গাইলের শাড়ির অন্যতম তাঁতি পরিবার। ১৯৪৭-এর বঙ্গভঙ্গের পরপরই, অধিকাংশ বসাক তাঁতি সম্প্রদায় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসন শুরু করে।

বিভিন্ন গবেষণা এবং এই শিল্পের আদি ধারার সাথে সম্পৃক্তদের বয়ানে এই শাড়ির উৎপত্তিস্থল হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে উঠে আসছে পাথরাইল, নলশোধা, ঘারিন্দাসহ টাঙ্গাইলের এমন বাইশ-তেইশটি গ্রামের নাম। একসাথে বাইশগ্রাম বলে চিহ্নিত করা হতো। এসব গ্রামই ঠিকানা ছিলো তাঁতীদের। যাদের পদবি ছিল ‘বসাক’। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ব্রিটিশ ভারতে টাঙ্গাইল ছিল ময়মনসিংহ জেলার এক মহকুমা।

১৮৫০ সাল বা তার কাছাকাছি সময়ে তৎকালীন ধামরাই এবং চৌহট্ট নামে দুটি গ্রামে মসলিনের উত্তরসূরী কিছু তাঁতি বসবাস করতেন। সন্তোষ, করটিয়া, দেলদুয়ারে জমিদারি পত্তনের সময় অন্যান্য পেশাজীবীদের পাশাপাশি ওই তাঁতিদেরও সেসব জায়গায় নিয়ে বসতি স্থাপন করা হয়। এসব গ্রামের মানুষেরা যে শাড়ি বয়ন করতেন তাই এক সময় ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

সম্প্রতি সময়ে ভারতের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে করা একটি পোস্টে বলা হয়েছে, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত একটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। এর মিহি গঠন, বৈচিত্র্যময় রং এবং সূক্ষ্ম জামদানি মোটিফের জন্য বিখ্যাত—এটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।’

এতে আরও বলা হয়েছে, ‘টাঙ্গাইলের প্রতিটি শাড়ি ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে দক্ষ কারুকার্যের নিদর্শন।’

ভারতীয় ভৌগলিক নির্দেশক রেজিস্ট্রি দফতর বলছে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হ্যান্ডলুম উইভারস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে টাঙ্গাইল শাড়িকে (জিআই স্বত্ব) ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে।

ভারতের মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশি নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে আমাদের আলস্যের ফলে টাঙ্গাইল জেলার পণ্য এখন ভারতীয় পণ্য হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাবে।

অথচ টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের একটি আবহমান ঐতিহ্য।

এর আগেও পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমে ভারত রসগোল্লা এবং নকশিকাঁথার জিআই স্বত্ব নিয়ে গেছে। অথচ দুই পণ্যের জন্মই পূর্ব বাংলা ছিল। এর আগে ফজলি আম ও নারকেলের মোয়া-এর স্বত্ব ভারত পেয়েছে।

শেষ মুহুর্তের চেষ্টায় জামদানী দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের মধু নিয়ে ভারতের আপত্তির ফলে ওদের নামেই জিআই স্বত্ব দিয়েছে। সারাবিশ্বেই জিআই স্বত্ব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

(জিআই) হচ্ছে কোনো সামগ্ৰীর ব্যবহার করা বিশেষ নাম বা চিহ্ন। এই নাম বা চিহ্ন নিৰ্দিষ্ট সামগ্ৰীর ভৌগোলিক অবস্থিতি বা উৎস (যেমন একটি দেশ, অঞ্চল বা শহর) অনুসারে নিৰ্ধারণ করা হয়। ভৌগোলিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সামগ্ৰী নিৰ্দিষ্ট গুণগত মানদণ্ড বা নিৰ্দিষ্ট প্ৰস্তুত প্ৰণালী অথবা বিশেষত্ব নিশ্চিত করে। ভৌগোলিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিভিন্ন সামগ্ৰী নিৰ্দিষ্ট অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করার অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা প্ৰদান করে।

টাঙ্গাইল শাড়ি এতটাই জনপ্রিয় ও পুরোনো যে তার নামে প্রবাদও প্রচলিত রয়েছে।

“নদী চর খাল বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন”

’‘চমচম, টমটম ও শাড়ি, এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি”

এ শাড়ি বাংলাদেশের নারীদের অত্যন্ত পছন্দের কাপড়।

বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরার জন্য যে শাড়িগুলো পৃথিবীর সব বাঙালির কাছে পরিচিত, তার মধ্যে রয়েছে জামদানি এবং টাঙ্গাইলের ভাইটাল তাঁতের শাড়ি, বিশেষ করে নকশি বুটি শাড়ি। বাঙালি নারী যেভাবে জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়িতে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন, তা আর কোনো শাড়িতেই হয় না।

দাবি উঠেছে বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থায় এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেন অভিযোগ জানানো হয়। আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী সম্পদ এভাবে অন্য কোনো রাষ্ট্র দাবি করবে– এটি হতে দেওয়া যায় না। টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের গর্বের জায়গা।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!