ছাত্র আন্দোলন, রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্র জনতার গনঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে দেশ থেকে স্বৈরশাসকের বিদায় হয়েছে। দীর্ঘ একমাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনের মুখে ছাত্র জনতা বিজয় লাভ করেছে। এ বিজয়ের পথ পারি দিতে রাজপথে ঝড়ে গেছে শতশত প্রাণ। শতশত মায়ের বুক খালি হয়েছে। ছাত্র সমাজ দেশের ক্রান্তিলগ্নে জেগে উঠেছে আরেকবার। ইতিহাসের পাতায় ছাত্রদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, ১৯৬২ সালের অগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের উত্তাল দিনগুলোর পাশাপাশি ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। তাই এ বিজয় অর্জনের চেয়ে আমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে। ১৯৭১ সালে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বিজয়ের পর আওয়ামীলীগের নাম দিয়ে দেশে বিভিন্ন মহল ফায়দা লুটিয়ে নিয়েছে। সেজন্য কয়েক বছরের মধ্যে আওয়ামীলীগ নিয়ে মানুষের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ এবং ঘৃণার জন্ম নিয়েছিলো। ২০২৪ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম দিয়ে কেউ যেন কোন অপকর্মে লিপ্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে বিভিন্ন চক্র বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নাম দিয়ে ফয়দা লুটিয়ে নেওয়ার জন্য কমিটি দিচ্ছে। ১৩ আগস্ট রূপগঞ্জে ছাত্রদের কাছে একজন ছাত্রলীগ কর্মী নিজেকে সমন্বয়ক দাবি করে কমিটি দেওয়ার জন্য ছাত্রদের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে (সূত্র: একাত্তর টিভি)। আন্দোলন কে বেগবান এবং সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য সমন্বয়ক তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু আন্দোলন বিজয় লাভ করার পর সমন্বয়ক এর নাম নিয়ে প্রভাব খাটানো ছাত্রদের সাথে একধরনের বৈষম্য। ছাত্রদের কে লক্ষ্য রাখতে হবে সমন্বয়ক নাম দিয়ে আওয়ামীলীগের আমলে ছাত্রলীগের সভাপতি, সহ-সভাপতি, বিভিন্ন পদধারীদের মত আচরণ না করতে পারে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসাশনের অনুপস্থিতিতে আবাসিক হল গুলোর গেটে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ছাত্ররা দিনরাত পাহারা দিয়ে যাচ্ছে এটি নিশ্চয় প্রসাংশা পাওয়ার যোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবৈধ ভাবে দখলকৃত হল গুলো উদ্ধার হয়েছে। ছাত্রলীগের রাজনীতি এবং অবৈধ ভাবে উদ্ধার কৃত সিটগুলো ফাঁকা না রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা, নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থীরাও হলে উঠানো হচ্ছে। এটি কি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে না? সে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যায়। ছাত্রলীগের দখলকৃত রুমগুলো এখন ফাঁকা রেখে প্রশাসন মেধা ভিত্তিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বণ্টন করলে তবেই বৈষম্য দূর হবে। যদি নতুন করে আবার অন্য কারো দখলে যায় তাহলে ছাত্রলীগ এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? যে লাউ সেই কদু।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। যেখানে শিক্ষকরা ক্লাসে পাঠদানের চেয়ে ক্লাসের বাহিরের সাদা-কালো, লাল-নীল, ফেরাম-কোরামের রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যাস্ত। তাদের দেখে মনে হয় রাজনৈতিক সভা সমাবেশে জন্য তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু ক্লাসে পাঠদান করলে তো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে প্রশাসনিক পদ দখল করা যাবে না। রাজনৈতিক বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাস্ত থাকার কারণে তারা সময় মতো ক্লাসে আসেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের ঘন্টার পর পর ঘন্টা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষকরা আমাদের দেশের শিক্ষকদের চেয়ে ব্যতিক্রম কারণ তাদের নিয়োগ হয় মেধার ভিত্তিতে টাকার বিনিময় বা অবৈধ ভাবে নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এর পরিবর্তে দেখা হয় তার গবেষণা আছে কিনা। কোন সুপারভাইজারের অধিনে গবেষণা করেছে। তার গবেষণা কোন জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। নিয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তার শিক্ষাকতা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে পদ স্থায়ী হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রাজনীতি নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে পারে না। সেখানে আমাদের দেশের মতো রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে পদন্নোতি পাওয়া যায় না। সেখানে পদন্নোতি পাওয়ার জন্য গবেষণা করতে হয়। রাজনৈতিক নেতার সুপারিশে পদোন্নতি হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের দলীয় ভাবে হয় না, হয় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে।
আমাদের দেশের ইউজিসি চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ হয় হয় রাজনৈতিক ভাবে। যার কারণে নিয়োগের পর তার দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই থাকে মূল লক্ষ্য। অথচ তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকার কথা ছিলো ছাত্রছাত্রীদের দিকে। কিভাবে তাদের জীবন থেকে সেশনজট নামক অভিশপ্ত বিষয়টি দূর করা যায়। কিভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়। এসব বিষয়ে তারা কোন কথা বলেন না, লেখেন না। তারা রাজনৈতিক দলের গুনগান গাইতে সময় পান। সে বিষয় নিয়ে পত্রিকার পাতায় বড় বড় কলাম লিখতে সময় পান। ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে, লিখতে সময় পান না। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের টাকা দিয়ে নিজেদের পক্ষে রাখা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দমিয়ে রাখা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন তাদের অধিকার, বিশ্ববিদ্যালয় দূর্নীতি নিয়ে কথা না বলতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রাখা। দলীয় শিক্ষকদের নিয়ে তার একটা বলায় তৈরি করা যেন তার অন্যায় দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে।
ছাত্রছাত্রীরা তাদের যৌবনের মূল্যবান সময় নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা বাদ দিয়ে সময় টুকু ব্যায় করছে নোংরা রাজনীতিতে। রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা নিজেদের দল গোছাতে ব্যস্ত অথচ রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা স্বপ্ন দেখাচ্ছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। যাদের নতুন কিছু উদ্ভাবনের বিষয় নিয়ে ধ্যান-জ্ঞান নিয়ে মেতে থাকার বিপরীতে তারা ব্যাস্ত স্লোগান দিতে, রাস্তায় মারামারি, হানাহানি করতে। আবাসিক হলের সিট দখল নিজেদের আধিপত্য কে কেন্দ্র করে মাঝে মধ্যে মারামারির বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংবাদ মাধ্যম গুলোতে খবর নিত্যাদিনের ঘটনা পরিণত হয়েছে। হলের সিট দখল এবং অধিপত্য বিস্তারের জন্য ছাত্র নেতারা ছাত্রদের গামছার মতো ব্যবহার করে আসছে। রাজনৈতিক নেতার অনুমতি ছাড়া কেউ আবাসিক হলে থাকতে পারেনি। গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখে আসছি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন গুলো ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে না। তারা বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনে তাদরে বিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন গুলো যদি ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা না বলে তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন আছে কি?
অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা পড়াশোনার জন্য ল্যাব লাইব্রেরিগুলো সারারাত খোলা থাকে গুলো সারা রাত খোলা থাকে। আমাদের দেশের লাইব্রেরি ও ল্যাব গুলোর ভিন্ন অবস্থা। সন্ধ্যার পর সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সপ্তাহে ছুটির দিন সহ বিভিন্ন ছুটিতে সেগুলো বন্ধ থাকে। ছুটির দিন ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ থাকে সেই সময় গুলো ছাত্রদের উপযুক্ত সময় লাইব্রেরি ও ল্যাবে কাটানোর কিন্তু সেই সুযোগ পাচ্ছে কোথায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি সহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যাকগাউন্ড না দেখে যোগ্য মানুষকে নিয়োগ দেওয়া দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম দূর্নীতি দূর করতে হবে। কোন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়োগ না দিয়ে মেধাবীদের নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণা পত্র পোস্টডক ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পদন্নোতির ক্ষেত্রে গবেষণা পত্র এবং তার শিক্ষকতার পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষকদেরকে ছাত্রদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবনের দিকে নজর দিতে হবে। কারণ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এর বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সকল প্রকার ছাত্র শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। তাহলে শিক্ষকরা রাজনীতিতে ব্যবহৃত সময় গুলো ক্লাসে ব্যায় করতে পারবেন। ক্লাসে জন্য ছাত্রদের অপেক্ষা করতে হবেনা। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা হলের সিট দখল, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রোগ্রাম জন্য কেউ তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। ফলে ছাত্ররা তাদের মূল্যবান সময়গুলো কে পড়াশোনা গবেষণার কাজে লাগাতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকস্বাধীনতা থাকতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। মত প্রকাশের কারণে আমাদের কারো পরিণতি বুয়েটের আবরার ফাহাদের মত না হয়। আর কোন মেধাবীর প্রাণ যেন অকালে ঝড়ে না পরে। আমার গত দিনগুলোতে দেখে আসছি কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তাকে ছাত্রদল, জামাত, শিবির বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের একধরনের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো। এই সাংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে যেন অন্য কোন বিরোধী দল বা জঙ্গি সংগঠনের ট্যাগ না লাগিয়ে দেওয়া হয়। ছাত্রদের ঐক্য বদ্ধ থাকতে হবে যেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে আর কোন রাজনৈতিক দল ছাত্রদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার না করে তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করুক। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা যেন ক্ষমতা পেয়ে গত বছরে ছাত্রলীগ নেতাদের মতো আচার-আচরণ না করতে পারে। কেউ যেন ক্ষমতার প্রভাব না খাটিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর জুলুম অত্যাচার করতে না পারে। শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনা সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরে আসুক এটাই কাম্য।
লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

