বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বৈষম্য রোধ হবে কবে?

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ পাঠ: ৪৪ বার

বৈষম্যহীন সমাজে সবচেয়ে বড় বৈষম্যের স্বীকার হয়ে আসছে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকগণ। প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন। ৯২ ভাগ মুসলিম প্রধান দেশেও ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে উদাসীন। এ যেন নিজ দেশে পরবাসীর মতো আচরণ করা হচ্ছে। ইসলামী রাষ্ট্রে বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্ম ইসলাম সহ সকল ধর্মীয় শিক্ষার সমান অধিকার থাকা প্রয়োজন। ৪০ বছরে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকার পরিবর্তন হলেও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা-২০১০, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা-২০১৮, বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রদত্ত অধিকার ও জাতীয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এসবের কিছুই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার পক্ষে কোন ধরনের সুফল বয়ে আনেনি। ২০১৩ সালে সাবেক সরকার দেশের প্রায় সব প্রাথমিক জাতীয়কারণ করলেও মাদ্রাসা শিক্ষার বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। গণমাধ্যমের (ইত্তেফাক) তথ্য মতে, সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫,৫৬৫ টি, শিক্ষক সংখ্যা ৩,৮৯,৯৪৯ জন পক্ষান্তরে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ৮ হাজার ৯৭২ টি এর মধ্যে অনুদান পায় ১৫১৯ টি মাদ্রাসা, শিক্ষক সংখ্যা ৩৭,২৬৫ জন এর মধ্যে অনুদান পায় ৪,৫২৯ জন। প্রাথমিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১১ তম গ্রেডে বিভিন্ন ভাতাসহ ২০,০০০+ টাকা বেতন পান। এবং সহকারী শিক্ষক ১৩ তম গ্রেডে বিভিন্ন ভাতাসহ ১৯,০০০+ বেতন পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক বেতন পান ৩,৫০০ টাকা এবং সহকারি শিক্ষক বেতন পান ৩,৩০০ টাকা। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করা হয় কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করা হয় না। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সংখ্যা কমানোর এটি একটি কৌশল।

৬৫০০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  বিপরীতে ১৫০০ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং বেতন কাঠামো দেখেই প্রতীয়মান হয় যে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে সরকার কতটা উদাসীন। ইসলামী শিক্ষাকে সংকুচিত করার জন্য বিগত শাসকগন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার দিকে নজর দেয়নি। বিগত সরকার একসাথে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় কে সরকারি করলেও মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে নজর দেয়নি। ইসলাম বিদ্বেষী  আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছে। ভারতে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা থেকে পাশ করে দাখিল পর্যায়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। দাখিল, আলিম ও ফাজিল তথা মাদ্রাসা শিক্ষা যেন মাথাচারা দিয়ে না উঠতে পারে সেটিই ছিলো মূল লক্ষ্য। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। ভিত্তি যদি দূর্বল করে দেওয়া হয়ে তাহলে দালান কোঠা উপরের স্তর এমনিতে ভেঙে যাবে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ধ্বংস করা মানে দাখিল, আলিম এবং ফাজিল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটানো। গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে না দিলো গাছের পাতা এমনিতে শুকিয়ে যাবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো মূলত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে। অন্য দিকে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগর ও মাদ্রাসা বিভাগের অধিনে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এই স্তরটিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে না নেওয়ার ফলে এই স্তর বিপাকে পড়েছে। ২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে স্বতন্ত্র হিসাবে যাত্রা শুরু করলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে এর সাথে সংযুক্ত করা হয়নি। দেশে দাখিল, আলিম ও ফাজিল স্তরের সাথে সংযুক্ত ইবতেদায়ি স্তরের শিক্ষকরা সংযুক্ত আছে তারা অন্য এমপিও স্তরের সাথে থাকা শিক্ষকদের মতো মূল বেতন, ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া এবং ৫০০ টালা চিকিৎসা ভাতা পান। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য এমন সুযোগ সুবিধা জোটেনি।

অন্তর্বতিকালীন সরকার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা বৈষম্য রোধে একটি নীতিমালা খসড়া করেছে। এটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা স্থাপন, স্বীকৃতি, পরিচালনা, জনবল কাঠামো এবং বেতন-ভাতাদি/অনুদান সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৪ নামে খসড়া প্রকাশ করেছে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে সরকার শুধু আশ্বাস দিয়ে থাকেন কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়ন হয় না। অবিলম্বে এটির বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই প্রদান করা। পাঠ্যসূচীতে ইমান আকিদা সহ ইসলামী বিষয় গুলো ভিত্তি যেন মজবুত হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি হওয়ায় চাকরি প্রত্যাশীদের আগ্রহের তুঙ্গে থাকে। প্রাইমারী বিদ্যালয়ে সুযোগ সুবিধা বেশি থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা শেষ করে সেই চাকরিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ থাকে। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় বেতন কাঠামো সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা শেষ করে চাকরিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায় না। সুযোগ সুবিধা বেশি থাকায় মেধাবীরা চাকরি হিসাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় কে বেছে নিচ্ছে। ফলে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা মেধাবী শিক্ষক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রাইমারী বিদ্যালয় গুলোতে ছাত্রদের মাসিক উপবৃত্তির ব্যবস্থা আছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মাসিক উপবৃত্তির ব্যবস্থা নেই ফলে শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থী বিমুখ হচ্ছে। এটিও বিগত সরকারের ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার একটি কৌশল। প্রাথমিক বিদ্যালায় গুলোর ন্যায় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য  উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বইসহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। বর্তমান সময়ে জেনারেল এবং মাদ্রাসা শিক্ষা সকল সিলেবাস প্রায় একই। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় বিষয়গুলো জেনারেলের তুলনায় অতিরিক্ত জ্ঞান লাভ করছে। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ইহকাল ও পরকালে দুইকালে জন জ্ঞান লাভ করছে। তারা অলরাউন্ডার হিসাবে তৈরি হচ্ছে। ছোটকাল থেকে যদি তারা ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে তাহলে তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে কাজে লাগতে ফলে সমাজ থেকে দূর্নীতি, মাদকাসক্ত সহ বিভিন্ন অন্যায় অনিয়ম দূর হবে।

মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে হলে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। ভিত্তি মজবুত হলে দাখিল, আলিম,  ফাজিল সহ মাদ্রাসা শিক্ষা পথ সুগম হবে। ২০২৪ সালের খসড়া চুড়ান্ত আকারে বাস্তবায়ন করতে হবে। ধীরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা গুলোকে জাতীয়করণ করতে হবে। তবে জাতীয়করণে দীর্ঘসূত্রিতা হলে এমপিও ভুক্ত করা হতে পারে প্রথম সমাধান। কারণ ৪০ বছর ধরে তারা বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষা দান করে আসছে তাদেরও পরিবার আছে। তাদরে মাথার উপরে পরিবারের ভরণ পোষণ করার দায়িত্ব আছে। একজন শিক্ষক যদি আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হোন তাহলে তার পাঠদানের প্রতি মনযোগ বাড়ে। মাদ্রাসা গুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে। সকল শিক্ষা উপকরণ প্রদান করতে হবে। তাই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে শেয়ার বিজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!