রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস চাই

ছাত্র সমাজ দেশের ক্রান্তিলগ্নে বারবার জেগে উঠেছে। ইতিহাসের পাতায় ছাত্রদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, ১৯৬২ সালের অগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ পতন সহ ২০২৪ সালের স্বৈরাচারী হাসিনা পতন ও উল্লেখযোগ্য। দেশে সকল অন্যায়, অবিচার, জুলুম হয়েছে তখনই ছাত্ররা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এর বিপরীত দিকও দেখা গিয়েছে। আমরা অতিতে ঘটনা দিকে তাকালে দেখতে পাবো যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৪ এর আন্দোলনের ৯ দফার অন্যতম দফা ছিলো লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা।
ক্যাম্পাস গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন গুলো প্রসাশনের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল দখল করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন করেছে। হলের একটি সিট পেতে হলে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, মিছিল, মিটিংসহ নানা ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নানা রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। আবাসিক হলগুলো ছাত্র সংগঠনের নেতারা হল প্রশাসনের সহায়তায় বর্গা নিয়ে সিট বানিজ্য, হলের ডাইনিং এর ভর্তুকি থেকে চাঁদা নেওয়ার কারণে ডাইনিংয়ে নিম্নমানের খাবার, ডাইনিং ফাও খাওয়া, হলের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদা আদায় সহ নানা ধরনের অপকর্ম করে থাকে। হল প্রসাশন এতে সায় দেয় কারণ তারও রাজনৈতিক ভাবে হলের প্রশাসনের দায়িত্ব পায়।
ছাত্র সংগঠন গুলোর মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকা উচিত কিভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো যায়। কিন্তু সংগঠন গুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে যেন কোন শিক্ষার্থী ক্ষমতাসীন দলের অনিয়ম দূর্নীতি বিরুদ্ধে কথা বললে তার টুটি চেপে ধরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত রাজনৈতিক দাস উপাচার্যকে টিকিয়ে রাখা। কেউ যেন উপাচার্যের অনিয়ম, দূর্নীতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলে সেদিকে খেয়াল রাখা। বিনিময়ে উপাচার্য নেতাদের কিছু নগদ অর্থ সরবরাহ করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার বাজি করা ছাত্রনেতাদের প্রধান কাজ।
ছাত্রছাত্রীরা তাদের যৌবনের মূল্যবান সময় নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা বাদ দিয়ে সময় টুকু ব্যায় করছে নোংরা রাজনীতিতে। যাদের নতুন কিছু উদ্ভাবনের বিষয় নিয়ে ধ্যান-জ্ঞান নিয়ে মেতে থাকার বিপরীতে তারা ব্যাস্ত স্লোগান দিতে, রাস্তায় মারামারি, হানাহানি করতে। আবাসিক হলের সিট দখল নিজেদের আধিপত্য কে কেন্দ্র করে মাঝে মধ্যে মারামারির বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংবাদ মাধ্যম গুলোতে খবর নিত্যাদিনের ঘটনা পরিণত হয়েছে। হলের সিট দখল এবং অধিপত্য বিস্তারের জন্য ছাত্র নেতারা ছাত্রদের গামছার মতো ব্যবহার করে আসছে। রাজনৈতিক নেতার অনুমতি ছাড়া কেউ আবাসিক হলে থাকতে পারেনি। বর্তমানেও আবাসিক হলে একই সাংস্কৃতি বিরাজমান সরকার পরিবর্তন হলেও এটির পরিবর্তন হয়নি।
বাংলাদেশের ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য তৈরি করে ফেলেছে ক্ষমতাসীন দলকে টিকিয়ে রাখার জন্য। অথচ তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিলো নিজেদের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করা। কিভাবে শিক্ষাক্ষেত্র বাজেট বাড়ানোর যায়, কিভাবে হলের খাবারের মান বাড়ানো যায়, লাইব্রেরিতে মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো, সপ্তাহে সাতদিন লাইব্রেরি খোলা রাখা যায়, শিক্ষক কেন নিয়মিত ক্লাস নেন না? কেন ক্লাস করতে এসে ছাত্রদের ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়? পরীক্ষা দেরি করে হচ্ছে কেন?, রেজাল্ট দিতে দেরি হচ্ছে কেন? কিভাবে সেশনজট দূর করা যায় এসব নিয়ে। একজন অযোগ্য উপাচার্য নিয়োগ হলে সেটি নিয়ে কথা বলা। উপাচার্যের অনিয়ম দূর্নীতি এর বিরুদ্ধে কথা বলা। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা। ছাত্র শিক্ষকদের অধিকার নিয়ে কথা বলা। ছাত্রদের আবাসিক হলের সিট বানিজ্য যেন না হয় সেটা নিয়ে কথা বলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতভাগ আবাসিক করা। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য কথা বলা। দেশের সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার নাম ছাত্র রাজনীতি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামিলীগ যেমন শোষণের রাজনীতি শুরু করেছিলো সমন্বয়করা কিছু জায়গায় সেরকম করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। তাদের কিছু কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয়কদের উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজেরারকে শপথ বাক্য পাঠ করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের গার্ড অব অনার গ্রহন করার সময় পাশে দুজন সমন্বয়ক দাঁড়িয়ে থাকা, উপাচার্যের হাত ধরে নিয়ে আসা, উপাচার্যের চেয়ারের সাথে হাত দিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাসহ নানা কার্যক্রমের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যেটি নিয়ে সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। সমন্বয়করা যেন বিগত বছর গুলোতে ছাত্রলীগের মতো হয়ে না উঠে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশের থিং ট্যাংক। কিন্তু তারা তাদের সেই স্থান হারিয়ে ফেলেছে রাজনৈতিক তেল মর্দন করতে গিয়ে। তারা লাল-নীল, সাদা-কালো, ডোরকাটা, ফোরাম কোরামে বিভক্ত হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের অন্য পেশাজীবি সংগঠনের মতো তারাও একটা সংগঠন হিসাবে দলের খেদমতে ব্যাস্ত। অথচ তাদের ব্যাস্ত থাকার কথা ছিলো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়ে, ল্যাবে গবেষণা নিয়ে। কিন্তু তাদের দেখে মনে হয় রাজনৈতিক সভা সমাবেশে জন্য তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু ক্লাসে পাঠদান করলে তো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে প্রশাসনিক পদ দখল করা যাবে না। রাজনৈতিক বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাস্ত থাকার কারণে তারা সময় মতো ক্লাসে আসেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের ঘন্টার পর পর ঘন্টা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষকরা আমাদের দেশের শিক্ষকদের চেয়ে ব্যতিক্রম কারণ তাদের নিয়োগ হয় মেধার ভিত্তিতে টাকার বিনিময় বা অবৈধ ভাবে নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড এর পরিবর্তে দেখা হয় তার গবেষণা আছে কিনা। কোন সুপারভাইজারের অধিনে গবেষণা করেছে। তার গবেষণা কোন জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। নিয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তার শিক্ষাকতা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে পদ স্থায়ী হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রাজনীতি নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে পারে না। সেখানে আমাদের দেশের মতো রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে পদন্নোতি পাওয়া যায় না। সেখানে পদন্নোতি পাওয়ার জন্য গবেষণা করতে হয়। রাজনৈতিক নেতার সুপারিশে পদোন্নতি হয় না। ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ সালে সমকালে প্রকাশিত হয় চবিতে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের ভাইবা দিতে এসে শিবির অভিযোগে ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হন নুর হোসেন নামে এক নিয়োগপ্রার্থী। ছাত্ররা রাজনীতি করে যদি মেধাবীদের শিক্ষক নিয়োগ দিতে বাঁধা দেয় তাহলে সেই রাজনীতি কি কল্যানকর?
উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের দলীয় ভাবে হয় না, হয় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমাদের দেশের ইউজিসি চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ হয় হয় রাজনৈতিক ভাবে। যার কারণে নিয়োগের পর তার দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই থাকে মূল লক্ষ্য। অথচ তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকার কথা ছিলো ছাত্রছাত্রীদের দিকে। কিভাবে তাদের জীবন থেকে সেশনজট নামক অভিশপ্ত বিষয়টি দূর করা যায়। কিভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়। এসব বিষয়ে তারা কোন কথা বলেন না, লেখেন না। তারা রাজনৈতিক দলের গুনগান গাইতে সময় পান। সে বিষয় নিয়ে পত্রিকার পাতায় বড় বড় কলাম লিখতে সময় পান। ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে, লিখতে সময় পান না। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের পুষে দিয়ে নিজেদের পক্ষে রাখা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দমিয়ে রাখা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন তাদের অধিকার, বিশ্ববিদ্যালয় দূর্নীতি নিয়ে কথা না বলতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রাখা। দলীয় শিক্ষকদের নিয়ে তার একটা বলায় তৈরি করা যেন তার অন্যায় দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে। এসব কাজ করেন রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে।
অনেকেই রাজনীতি নিষিদ্ধের বিপক্ষে কারণ নাকি রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে ভবিষ্যত নেতা তৈরি হবে না। তাদের কাছে প্রশ্ন বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নাই তাদের দেশেকে কি নেতা তৈরি হচ্ছে না? তাদের দেশেরও নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে কিন্তু তারা গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিক দিয়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে আর আমরা? তৈরি করছি নেতা আর টাকা দিয়ে ধার করে নিয়ে আসছি অন্যের তৈরি করা জিনিস।
লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

