সমুদ্রের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস

উড়ি একসাথে নীলে নীলে, উড়ি একসাথে মিলে ঝিলে। চল বন্ধু চল, চল বন্ধু চল গানের মতো ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের বন্ধুরা বের হয়েছিলাম কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিন ঘুরতে। ক্যাম্পাসে ক্লাস, ইনকোর্স, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে ব্যাস্ত সময় অতিবাহিত করতে একধরনের একঘেয়েমি চলে আসছিলো। ডিসেম্বরে সেমিস্টার ফাইনাল শেষ করে বন্ধুরা বলতে লাগলো রিফ্রেশমেন্ট দরকার। অমিত, সম্পদ মামুন সহ কয়েকজন বন্ধু মিলে পরিকল্পনা করে ক্লাসে সবার সাথে আলোচনা করে ভ্রমণের জায়গা ঠিক করা হলো বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের স্থান কক্সবাজার এবং বাংলাদেশের একমাত্র প্রবল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। স্যারদের সাথে প্রাথমিক আলোচনা করে মৌখিক সম্মতি নিয়ে ট্যুর এজেন্সি সহ হোটেল ভাড়া জাহাজের টিকিট সব নিশ্চিত করা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস এবং বিভাগের অনুমতি এসব নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তার দোলাচালে দুলতে থাকলো আমাদের শিক্ষা সফর। জল্পনার কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সব কিছু নিশ্চিত করে আমরা ২১শে জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেলে কক্সবাজারের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। আমাদের সাথে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. গোলাম মহিউদ্দিন এবং অধ্যাপক ড. মুর্শিদ আলম স্যার রওনা দিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ১৫ ঘন্টার বাস ভ্রমণ শেষে বুধবার ভোরে কক্সবাজার পৌছালাম। বাস থেকে নেমে হোটেল গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে আমরা স্যারের সাথে বীচে গেলাম। সাগরের বিশাল জলরাশীর ঢেউ সমুদ্র পাড়ে আঁচড়ে পড়ছিলো। পানির মধ্যে সবাই মিলে ছবি উঠানো, ফুটবল খেলা, ফুটবল নিয়ে পানির মধ্যে ফুটবল দিয়ে বোমাবাইস্টিক খেলা শেষ হোটেলে এসে গোসল করলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে চান্দের গাড়ি ভাড়া নিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ পথে আমার হিমছড়ি, ইনানী, পাটোয়ার টেক সি বীচের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। হিমছড়ি গিয়ে ৩৫ টাকা টিকেট কেটে সমুদ্রের তীরে পাহাড়ে উঠে পাহাড় ও সমুদ্র একসাথে দেখালাম। তারপর পাটোয়ার টেক সি বীচে গেলাম। সেখানে সমুদ্রের নীল জলরাশির ঢেউ গুলো পাথরের উপর আঁচড়ে পরার দৃশ্য দেখলাম। সূর্যাস্তের দৃশ্য সেখানে উপভোগ করলাম, সূর্য যেন পানির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে এমন মনে হলো। হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে মুর্শিদ স্যারের নেতৃত্বে কেনাকাটা শেষে সি বীচে গেলাম। রাতের বীচ যেন অন্য রকম সুন্দর। চারদিকে সুনসান নিরবতায় সমুদ্রের গর্জনের শব্দ মনে প্রশান্তি এনে দিলো।
বৃহস্পতিবার ভোরে ঘুম থেকে উঠে নুনিয়ারছড়া জেটি ঘাট থেকে রওনা দিলাম সেন্টমার্টিন যাওয়ার উদ্দেশ্য। জাহাজ সমুদ্রের নীল জলরাশির মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। জাহাজে সমুদ্রের ঢেউ আঁচড়ে পড়তেছিলো। মাঝ সমুদ্রের পাখিরা জাহাজের দিকে উড়ে আসার অপরূপ সুন্দর্য অবর্ণনীয়। আমরা মুর্শিদ স্যার সহ ছেলেরা জাহাজের গিটার কাহন নিয়ে গানের আসরে বসলাম। স্যার সহ মেহেদী, তৃশান, উসান, অনুদার কণ্ঠে বিভিন্ন ধরনের গান গাইতে লাগলো। পরিচিত গান গুলোতে সবাই গলা মিলিয়ে গান গাইলো। সময়ের সাথে গানের আসর জমজমাট হতে শুরু করল, জাহাজে যাত্রীরা সিট থেকে উঠে এসে আমাদের সাথে গানের আড্ডা উপভোগ করতে লাগলো।
দীর্ঘ ৮ ঘন্টার জাহাজ ভ্রমণ করে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বাংলাদেশের একমাত্র প্রবল দ্বীপ সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছাইলাম। সেন্টমার্টিনের অসীম নীলাকাশের সাথে নীল জলরাশি। চারদিকে সারি সারি নারিকেল গাছের অপরূপ সুন্দর্যের লীলাভূমি। আমারা বেলাভূমি ইকো রিসোর্ট উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার স্বাদ নিয়ে বীচে হাটতে গেলাম। কয়েকজন মিলে সমুদ্র তীরে পাথরের উপর বসে চোখ জুড়ানো অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে খোশগল্পে মজে উঠলাম। পরের দিন ভোরে ৫ টায় উঠে আমরা ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে কোস্ট গার্ডের বাঁধায় ছেঁড়া দ্বীপের পৌঁছাতে পারলাম না। সেখানে থেকে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে আমরা সবাই মিলে বীচের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। বীচে গিয়ে জোড় এবং বিজোড় রোল নাম্বারের ভিত্তিতে দুইভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতি ফুটবল ম্যাচ খেললাম। অধ্যাপক ড. মুর্শিদ আলম স্যার আমাদের ফুটবলে লাথি দিয়ে আমাদের খেলার উদ্বোধন করেন। খেলা শেষে সবাই মিলে সমুদ্রে গোসল করে জুম্মার নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষ বিকেল বেলা স্যারের সাথে আমরা সবাই পায়ে হেঁটে পুরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরলাম। সন্ধ্যা বেলা অধ্যাপক ড. গোলাম মহিউদ্দিন স্যার একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আয়োজন করেন। আমরা রাতে সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ পার্টি এবং পাশে মুর্শিদ স্যারের গান, মহিউদ্দিন স্যারের কবিতা সহ বন্ধু বান্ধবীরা কুরআন তেলওয়াত, নাশিদ, কবিতা, গান ও নৃত্য পরিবেশন করে আমাদের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা কে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। পরের দিন সকাল বেলা অমিত, সজিব, মোদাচ্ছির, মামুন এবং মনিকান্ত মিলে বীচে সাইকেল চালিয়ে সম্পুর্ন দ্বীপ ঘুরে দেখালম। শিক্ষা সফরে টি আনন্দময় করে তুলেছিলো আমাদের শিক্ষকগণ। আমাদের সাথে ঘুরাঘুরির সময় বিভিন্ন সময় বন্ধুর মতো মিশে রসিকতায় মজে ছিলেন সবার প্রিয় মুর্শিদ স্যার। চারদিনের আনন্দময় মহূর্ত গুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে সারাজীবন। এইতো কদিন পর পড়াশোনা শেষ করে সবাই নিজেদের কর্মজীবনের জন্য ছড়িয়ে পড়বে বিভিন্ন জায়গায়। স্মৃতি হয়ে থাকবে বন্ধুত্বের বন্ধনে কাটানো সময়গুলো।
লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

