বয়স বৃদ্ধি নয়, সেশনজট হ্রাসই সমাধান

দীর্ঘ দিন ধরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা বাড়ানোর আন্দোলন চলছে। বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিটি অনেক বছর ধরেই তোলা হচ্ছে৷ আওয়ামী সরকার দাবিটি পূরণ করেনি তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হওয়া পর এটি জোরালো হয়েছে । তারই পরিপেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। উক্ত পর্যালোচনা কমিটি পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩৭ বছর করার জন্য সুপারিশ প্রদান করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়েছে। আন্দোলন কারীরা বয়স সীমা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, উচ্চ শিক্ষায় সেশনজট, উন্নত দেশগুলোর বয়স সীমা, সরকারি চাকরির সাথে অন্য ব্যাংক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরির বয়স সীমা, করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষা জীবন থেকে দেড় থেকে দুই বছর লস তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের লেখা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ইতিহাস বইয়ের তথ্যানুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের শেষ দিকে আইসিএস পরীক্ষা দেওয়ার সর্বোচ্চ বয়স ছিল ২৩ বছর। পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এ বয়সসীমা ২৪ বছর নির্ধারিত ছিল। পরে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ে বয়সসীমা ছিল ২৫ বছর। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ২৭ বছর নির্ধারণ করা হয়। ১৯৯১ সালের ৩১ জুন তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপন বলছে, তখন বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয় ৩০ বছর। তবে করোনার সংক্রমণজনিত পরিস্থিতির কারণে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল। যেমন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি সব চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগে (বিসিএস ছাড়া) প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমায় ৩৯ মাস ছাড় দেয় সরকার।
চাকরির বয়স সীমা ৩৫ বছর হলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। পূর্বে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে ৫-৬ বছর চাকরির পিছনে ছুটতো। এই ৫-৬ বছর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দেশের কোন প্রোডাক্টিভ কাজে না গিয়ে সে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি এবং গনিত নিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকে। যদি চাকরির বয়স সীমা ৩৫ করা হয় তাহলে ১০ বছর ধরে চাকরির পিছনে ছুটবে। ফলে এই ১০ বছর সে দেশের কোন প্রডাক্টিভ কাজ করবে না। ফলে দেশের অর্থনীতিতে সে অবদান রাখতে পারবেনা।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ জনসংখ্যা মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসে। ফলে ২৫ বছর শেষ হলে তাকে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। সংসার করতে হলে সব চেয়ে বড় কাজ হচ্ছে বিয়ে করা। কিন্তু বিয়ের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছেলে কি করে? ছেলের কোন চাকরি না থাকলে মেয়েদের পরিবার থেকে বিয়ে দিতে চায় না। বিয়ের জন্য চাকরি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বয়সসীমা ৩৫ করলে একজন ২৫ বছরের সদ্য গ্রাজুয়েটের চেয়ে ৩৪-৩৫ বছরের গ্রাজুয়েটদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। ফলে একজন শিক্ষার্থীকে ৩৫ বছর পর্যন্ত পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে হবে। চাকরি পাওয়ার পর ট্রেনিং বিভিন্ন ভেরিফিকেশন সহ যোগদান করতে ৩/৪ বছর চলে যায়। চাকরিতে যোগদান করার পর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে প্রায় ৪৫ বছর লেগে যাবে। ফলে তরুণ অবস্থায় একজন মানুষের যে কর্ম স্পৃহা থাকে বৃদ্ধ অবস্থায় সেটি পাওয়া যাবে না। ফলে তারুণ্যের শক্তি থেকে দেশ বঞ্চিত হবে। দীর্ঘ দিন বেকার থাকার ফলে পরিবারিক এবং সামজিক বিভিন্ন চাপের ফলে শিক্ষার্থীরা ডিপ্রেশনে বেশি ভুগবে। ডিপ্রেশনের কারণে অনেকেই আত্মহত্যার মতো পদক্ষেপ ও গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব সহ অবৈধভাবে চাকরিতে ঢোকা নিত্যদিনের ঘটনা। চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি পেলে সেটির দৌরাত্ম্য আরো বাড়াতে পারে। ফলে চাকরির বাজার অস্থির হয়ে উঠবে কারণ প্রতিযোগী বাড়বে কিন্তু চাকরির পদ সংখ্যা বাড়বে না। ফলে দেশ সংস্কারের যে পদক্ষেপ সেটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে। চাকুরির বয়সসীমার চেয়ে আমাদের সিস্টেম সংস্কারে মনযোগ বেশি দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিভাবে সেশনজট দূর করতে হবে। চার বছরের অনার্সে কেন ৬/৮ বছর লাগতেছে সেটি নিয়ে ভাবা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে যেন অনার্সে ৪ বছর এবং মাস্টার্স ১ বছরে শেষ হয় সেদিকে মনযোগী হতে হবে।
আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য আলাদা ভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়। চাকরির ক্ষেত্রে একাডেমিক পড়াশোনাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেদিকে মনযোগী হতে হবে। সেজন্য বিসিএস সহ সকল ধরনের চাকরির পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। যেন শিক্ষার্থীদের গঁদবাধা কোন কিছু দিনের পর দিন মুখস্থ না করতে হয়, যেটি তার চাকুরির ক্ষেত্রে কোন কাজে আসবে না। করোনা মহামারী সময়ের ঘটতি, গড় আয়ু বাড়া এবং বিভিন্ন কারণে চাকরির বয়স ৩৫ না করে ৩২ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের সিস্টেমের পরিবর্তন করতে হবে। যেন বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সেশনজট না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির প্রবেশের ক্ষেত্রে কেউ যেন অনিয়ম দূর্নীতি করে অবৈধ ভাবে নিয়োগ না পায় এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক,
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

