বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বৈরাচারের নেপথ্যে ব্যক্তি পূজার রাজনীতি

Author

মোছাঃ মিথিলা খাতুন , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ পাঠ: ১৬৮ বার

স্বৈরাচারের নেপথ্যে ব্যক্তি পূজার রাজনীতি
মোছাঃ মিথিলা খাতুন
রাজনীতি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণের মতামত ও সমর্থনের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কিন্তু যখন রাজনীতি কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে এবং সেই ব্যক্তি জনগণের চেতনায় অতিমানবীয় অবস্থানে পৌছে যান, তখন গণতন্ত্রের মূল চেতনা বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা ব্যক্তিপুজার রাজনীতির জন্ম দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি গড়ে তোলে। স্বৈরাচার কখনো আকস্মিকভাবে জন্ম নেয় না। নেতার প্রতি অস্ত্র আনুগত্য এবং তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত মনে করাই স্বৈরাচারের ভিত্তি। এটি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি সুপরিকল্পিত ধাপ অনুসরণ করা হয়।
১. গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ। গণমাধ্যম ব্যক্তি পূজা বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার। রাষ্ট্রীয় বা শাসক-সমর্থিতগণমাধ্যম নেতাকে একজন ত্রাতা বা অতিমানব হিসেবে উপস্থাপন করে। তার কর্ম ও সিদ্ধান্তকে সবসময় ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয় এবং তার সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল বলে চিত্রিত করা হয়। ২. শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শাসকের গুণকীর্তনকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা হয়।
জাতীয় দিবস এবং সরকারি অনুষ্ঠানে নেতার ছবি, বক্তব্য এবং কৃতিত্ব অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নেতার প্রতি অন্ধভক্তি নিয়ে বেড়ে ওঠে। ৩. দেশপ্রেমের অজুহাত। ব্যক্তি পূজায় দেশপ্রেমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জনগণকে বোঝানো হয়, নেতার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা। এতে ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত হয়। ৪. আইন ও বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার।
শাসকের সমালোচকদের দমন করতে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়। বিরোধীদের গ্রেপ্তার ভিন্নমত রোধ, এবং ভীতির পরিবেশ তৈরি করে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বৈরাচার ব্যক্তিপূজার রাজনীতির সরাসরি ফলাফল, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রকে এক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজ, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিপূজার ফলে আইনসভা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসন শাসকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস পায় এবং বিরোধী কন্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে পড়ে। একক নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি হ্রাস করে, ফলে শাসকের ভুল সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। এর ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়ে যায় এবং শাসক বিনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের সম্পদ এবং ক্ষমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। এক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর রাষ্ট্র পরিচালিত হলে ন্যায়বিচার ও সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত হয় না। প্রভাবশালীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা তৈরি হয়, যা সমাজে বৈষম্য
বাড়িয়ে তোলে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ সৃষ্টি করে সময়ের সাথে সাথে এই বৈষম্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। এর ফলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং শাসককেন্দ্রিক একটি অগণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বৈরাচারী ব্যক্তিপূজা কেবল একজন শাসকের ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যম নয়, বরং তা পুরো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে জনগণকে সচেতন করতে হবে যে কোনো ব্যক্তি নয়, বরং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। ব্যক্তিপূজার বদলে ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণকে অবগত করা জরুরি।  আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শাসক বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার চর্চা বাড়াতে হবে। নেতা বা শাসকের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ।
একক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না থেকে যৌক্তিক  দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। গণমাধ্যমকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারে এবং শাসকের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম সমাজের দৃষ্টিসম্পন্ন কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে, যা শাসককে দায়িত্বশীল রাখে এবং জনগণকে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে সচেতন করে তোলে। শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করা এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
একটি শক্তিশালী গনতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য
শিক্ষার ব্যবস্থাকে এমন ভাবে সাজাতে হবে যাতে নাগরিকরা
তাদের অধিকার কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়।
শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে ব্যাক্তিপুজার রাজনীতি প্রতিহত করা সম্ভব হবে এবং জনগণের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে।  ব্যক্তি পুজার রাজনীতি কেবল গণতন্ত্রের জন্য নয়, সমাজের জন্যও বিপদজনক। এটি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে এবং জনগণের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশই এ চক্র থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে এই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে যে বাক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।
শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!