বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিক্ষা ব্যবস্থা কি বাণিজ্যে পরিণত হচ্ছে

Author

মোছাঃ মিথিলা খাতুন , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৫ পাঠ: ৬২ বার

শিক্ষা ব্যবস্থা কি বাণিজ্যে পরিণত হচ্ছে

মোছাঃ মিথিলা খাতুন

জনাব আলাউদ্দিন ক্লাস নাইনের ইংরেজি ক্লাসে প্রবেশ করে বোর্ডে একটি প্যাসাজ লিখে বললেন, “এই ন্যারেশনটি কর।” মিতা হতাশ কণ্ঠে বলল, “স্যার, আপনি তো নিয়ম শেখাননি, তাহলে কিভাবে করব?” উত্তরে জনাব আলাউদ্দিন বললেন, “তুমি কয়দিন পরেই পরীক্ষা দেবে, আর এই সহজ বিষয়গুলো পারছ না?” মিতা বলল, “স্যার, নিয়ম না জানলে কিভাবে করব?” তিনি কড়া গলায় বললেন, “প্রাইভেট পড় না নাকি? মুখে মুখে কথা বলবে না, এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে।”

এই দৃশ্যটি বাংলাদেশের একটি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র। কিন্তু এটি শুধু একটি স্কুলের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “শিক্ষাই হল সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা তুমি পৃথিবী পরিবর্তনে ব্যবহার করতে পারো।” কিন্তু বাংলাদেশে আজ সেই শিক্ষাই যেন বাণিজ্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তির মানসিক ও নৈতিক বিকাশ, সমাজ ও জাতির অগ্রগতি কিন্তু তা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। বরং শিক্ষা এখন একটি লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে গুণগত মানের চেয়ে অর্থের প্রবাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। প্রথমত, কোচিং বাণিজ্য এবং নোট-গাইড নির্ভরতা। আজকাল শিক্ষার্থীদের মূল বইয়ের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা নোট-গাইডের উপর বেশি নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে। “এডুকেশন ওয়াচ ২০২২” এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের সাথে যুক্ত। শিক্ষাক্ষেত্রে কোচিং শিল্পের বাজার মূল্য বছরে প্রায় ৩৭০০ কোটি টাকা (সূত্র: গণমাধ্যমের প্রতিবেদন)। দ্বিতীয়ত, গাইড বইয়ের উচ্চমূল্য। বর্তমানে নবম-দশম শ্রেণির একটি গাইড বইয়ের দাম ১০,০০০-১২,০০০টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে এই গাইড বইয়ের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা মূল পাঠ্যপুস্তক থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রসার। বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, স্কুল ও

কলেজের জন্য ২৩ ধরনের অতিরিক্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি বছরে ১০-১৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। চতুর্থত, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোকে উচ্চমর্যাদা দেওয়া হয়, ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পঞ্চমত, সরকারি বা আধা-সরকারিপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। সরকারি স্কুল-কলেজগুলোরপ্রায় ৩০% শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া জটিলতার কারণে ধীরগতিতে চলছে। এছাড়াও, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় ভূমিকা পালন করছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম সংস্কারসহ বিভি-ন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাপকভাবে কাজ করছে। শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিনির্ধারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রভাব বেশি, যার ফলে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা সহজ হয়ে যাচ্ছে। ষষ্ঠত, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যার ফলে শিক্ষা ক্রমশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের ব্যক্তির মাসিক আয় প্রায় ২৫,০০০ টাকা বা এরও কম। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক আবেদন ফি, চূড়ান্ত আবেদন ফি, ভর্তি ফি, কোচিং ফি ও যাতায়াত খরচসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট

ব্যয় ৫০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ টাকার মতো দাঁড়ায় যা একজন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একদম অসম্ভব। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে বড় শিকার নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার। এছাড়াও সরকারি স্কুল-কলেজেরমান কমে যাওয়া এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি বৃদ্ধির কারণে তাদের জন্য মানস্মত শিক্ষা গ্রহণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ৪০% শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিরত থাকে। ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে শিক্ষার বিভাজন আরও প্রকট হচ্ছে, যা সমাজে অসমতা তৈরি করছে। এছাড়াও, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে। মেধার চেয়ে অর্থের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায়, সৃজনশীলতা ও গবেষণার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যায় আটকে যাচ্ছে, যা তাদের স্বাধীন চিন্তা-ভাবনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন করতে হবে। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে তারা কী পড়াচ্ছে তার ফিডব্যাক নিতে হবে এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। শিক্ষার্থীদের মূল বই এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের উপর জোর দিতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর ফি বাড়িয়ে থাকে, তাদের এই কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং তাদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণ সহজ হয়। চতুর্থত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ফি সহনীয় মাত্রার মধ্যে রাখা এবং একক ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি পুনর্বহাল করা। পঞ্চমত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা যদি বাণিজ্যে পরিণত হয়, তবে তা কেবল ব্যক্তির ভবিষ্যৎই নয়, গোটা জাতির উন্নয়নের পথকেও রুদ্ধ করে দেবে। আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে এবং শিক্ষাকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। নেলসন ম্যান্ডেলার কথায় আবার ফিরে যাই, “শিক্ষাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র” এটিকে যেন আমরা লাভের হাতিয়ার বানিয়ে না ফেলি।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।
mithila6596@gmail.com

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৮ মার্চ ২০২৫ তারিখে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!