বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আদৌ উপযুক্ত

Author

মোছাঃ মিথিলা খাতুন , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৯৬ বার

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আদৌ উপযুক্ত
মোছাঃ মিথিলা খাতুন
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে চলছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জোয়ার। সকল দেশ নেমেছে আধুনিক প্রযুক্তিগত বিশ্বে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে এক প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুদ্ধে। সেখানে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজও আটকে আছে সেই প্রাচীন মুখস্থ বিদ্যার যুগেই। বিশ্বের সব কিছু আপগ্রেড হলেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন সেই আদিম যুগেই আটকে আছে। সাম্প্রতিক, ডেইলি স্টার-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান বৈশ্বিক ব্যবস্থার ৭ম শ্রেণি পাসের সমান! এই কথা কিছুটা হতাশাজনক হলেও এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশ শিক্ষা কারিকুলাম আর অন্যান্য দেশের শিক্ষা
কারিকুলামের তুলনা করলেই এর প্রমাণ মিলে। যেখানে আমাদের দেশে বাচ্চাদের বিদ্যা গিলানো হচ্ছে সেখানে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে সুন্দর করে বাচ্চাদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আদৌ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে টিকে থাকার উপযোগী? সব কিছু আমাদের আধুনিক চাই, শুধু শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া। যেখানে অন্যান্য দেশের মানুষ দক্ষতা অর্জন সম্পূর্ণ করার পরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদেরকে সরিয়ে দিতে শুরু করেছে, সেখানে আমরা এখনো মুখস্থ বিদ্যার উপরে নির্ভর করছি। উদাহরণ হিসেবে ভারতের আইটি সেক্টরের সম্প্রতি কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা বলা যায়। মূলত, উপনিবেশ শাসন আমলে ব্রিটিশদের শাসন-শোষণ ও বাণিজ্য
সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য কর্মচারীর প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু তখন ইংল্যান্ড থেকে এই কর্মী আনা সম্ভব ছিল না। তাই ১৮৮৫ সালের দিকে এডুকেশন বোর্ড গঠন করা হয়। যার প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন শ্রেণি তৈরি করা যারা ইংরেজিতে কথা বলবে এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অর্থাৎ ইন্ডিয়ান বডি, ইংলিশ মাইন্ডেড। এই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারা প্রথমে মাদ্রাসা, কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে। তবে একসময় উপমহাদেশ থেকে তারা চলে যায়। কিন্তু তারা চলে গেলেও তাদের সেই কেরানি তৈরির সিলেবাসটা রেখে গিয়েছে আমাদের মাঝে। আর বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা তারই কিছুটা পরিবর্তিত-পরিমার্জিত সংস্করণ। আর আমরা এখনো তাদের ঐ  সিলেবাস অনুযায়ী পড়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি! ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সকল দেশের কারিকুলাম সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ যেন তার ব্যতিক্রম। এশিয়ার পরাশক্তি চীনের কথাই ধরা যায়, চীন প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং শেখাচ্ছে। আর আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কী
শেখানো হচ্ছে? আমাদের দেশে তো একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ঐঞগখ করানো হয় খাতায়! বিশ্ব যখন অও, ডিজিটাল লিটারেসি ও রোবোটিক্সের দিকে ঝুঁকছে, আমরা তখনও মুখস্থ বিদ্যার উপরেই জোর দিচ্ছি। চওঝঅ (Program for International Student Assessment) এর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গ্লোবাল র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সব থেকে নিচে। আবার, টঘউচ-এর মানব উন্নয়ন সূচক (ঐউও) অনুসারে, বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালের থেকেও নিম্ন। এছাড়াও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডঊঋ) গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট-এ দক্ষতার দিক থেকে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৭তম। বিআইডিএস-এর ভাষ্যমতে দেশের ৬৬% স্নাতক বেকার শুধুমাত্র চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে। তবে আইবিএম-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেটা সায়েন্স, অও সেক্টরে ৯৭ মিলিয়ন নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে কিন্তু আমাদের কাছে তো এর ৫%ও দক্ষ শিক্ষিত নেই। এই দায়ভার কিন্তু রাষ্ট্র কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। এর
জন্য দায়ী কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই। বিশ্বব্যাংকের মতে, শিক্ষার গুণগত মান ১% উন্নত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৩৭% বাড়ে। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষ করতে হবে, তবে শুধুমাত্র সার্টিফিকেটভিত্তিক ভুয়া দক্ষ নয়! এক্ষেত্রে গুগল-মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম শুরু করা যেতে পারে!
সর্বোপরি, আমাদের এই ব্যবস্থা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। এজন্য প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তবে তার আগে অবশ্যই শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে হবে! শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে দূরে সরাতে হবে। শিক্ষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো যাবে না! আশা কুরা যায় তাহলেই পাচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে নতুন প্রণীত ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ কুরবে। এছাড়াও বাজেট শুধু বাড়ালেই হবে না। বাজেট কী কাজে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই দিকে কঠোর জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায়, প্রযুক্তি-নির্ভরনতুন এই উপনিবেশনের যুগে আমরা ডিজিটাল দাসে পরিণত ইবো!
লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া। mithila6596@gmail.com
লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!