বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সার নিয়ে কারসাজি : কৃষককে বাঁচাতে ব্যবস্থা কোথায়?

Author

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন , কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৯৭ বার

সার নিয়ে কারসাজি : কৃষককে বাঁচাতে ব্যবস্থা কোথায়?

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতিতে সার কেবল একটি রাসায়নিক উপাদান নয়, এটি কোটি কোটি কৃষকের জীবনের নিশ্চয়তা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। ধান, পাট, আউশ, আলু, পটল কিংবা নানাবিধ সবজি প্রতিটি ফসলের নিবিড় পরিচর্যায় সারের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার ফলন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। ফসল রোপণ থেকে শুরু করে ফলন তোলার আগ পর্যন্ত, নির্দিষ্ট সময়ে সঠিকমাত্রায় সার প্রয়োগ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের কৃষি খাতে সারের সরবরাহ ব্যবস্থায় এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাঠে পর্যাপ্ত সরবরাহ, এমনকি সরকারি গুদামে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা প্রায়শই সঠিক সময়ে ব্য সরকারের নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। এই বৈপরীত্যের ফলস্বরূপ সৃষ্ট হচ্ছে এক ‘কৃত্রিম সংকট’, যার পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত চক্রান্ত। এই সিন্ডিকেটের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে বাজারদর বৃদ্ধি করা এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া। কৃষকদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই ‘ইনপুট’ প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ার এই কারসাজি সরাসরি কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে, ঋণের বোঝা বাড়ায় এবং চূড়ান্তভাবে দেশের খাদ্য উৎপাদনকে ব্যাহত করে।

সরকারি তথ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো ধরনের বাস্তব বা প্রকৃত অভাব নেই। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি) নিয়মিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে সারা দেশে তাদের চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ নিশ্চিত করছে। ইউরিয়া সারের সরবরাহ মূলত বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, অন্যদিকে বিএডিসি এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি সার বিতরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। চলতি মৌসুমেও সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় কাতার, সৌদি আরব ও মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষাধিক টন সার আমদানি অনুমোদন করা হয়েছে, যা মজুতকে আরো শক্তিশালী করেছে। ভর্তুকি মূল্যে এই সার কৃষকের কাছে পৌছানোর জন্য সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ করে। কাগজে-কলমে এই সাপ্লাই চেইন যতটা ত্রুটিমুক্ত ও মজবুত, মাঠ পর্যায়ে এর চিত্র ঠিক ততটাই ভিন্ন ও হতাশাজনক।

মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো: কৃষকরা প্রায়শই অভিযোগ করছেন, “ডিলারদের গোডাউনে সার থাকলেও তারা নানা অজুহাতে ঠিক সময়ে বিক্রি করছে না, আবার বিক্রি করলেও সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।” বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, যেমন কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রকট। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর

বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এই চিত্র উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডিলারদের একাংশ সরকারি দামে বিক্রয় না করে সার মজুত রেখে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করছে এবং পরবর্তীতে কালোবাজারে তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। এতে স্পষ্ট, সমস্যা কেবল সরবরাহজনিত নয়, বরং এটি বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত অপচেষ্টা এবং আর্থিক দুর্বৃত্তায়ন।

কৃষকরা তাদের পেশাগত জীবনে সক্রিয়ভাবে উৎপাদনশীল হলেও, সঠিক ‘ইনপুট’ তথা সারের অভাবে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকরকম ব্যাহত হয়। এই কারসাজির ফলে কৃষকের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারা। ফসলের জীবনচক্রে একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে যখন সারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

উদাহরণস্বরূপ, আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর বা কাইচ ঘোড় আসার সময় যদি সঠিক পরিমাণে ইউরিয়া বা পটাশ সার প্রয়োগ করা না যায়, তবে ফলন ২৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পরে ক্ষেতে একদিকে যেমন কষকের উৎপাদন খরচ (বেশি দামেয়ার কেনা বা এর সিকদার অনুষ্ঠাদিয়ে জমিতে সেচ/অন্যন্য কাজ করানো) বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে তেমনি ফসলহ- ানির ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণ করে সার কেনেন। সারের দাম বাড়লে তাদের ঋণের পরিমাণ বাড়ে এবং ফলন কমলে সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এই চক্রটি গ্রামের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তোলে। শুধু সারের ক্ষেত্রে নয়, খামারিরা বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি ইনপুট-এর ক্ষেত্রেও একই সিন্ডিকেটেড ভোগান্তির শিকার হন। সঠিক ইনপুট ব্যতীত উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানে শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত।

কৃষককে বাঁচাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিচে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কতিপয় কার্যকর পদক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

সাপ্লাই চেইন স্বচ্ছ ও ডিজিটাল মনিটরিং বৃদ্ধি সার ডিলারদের কার্যক্রমকে শতভাগ স্বচ্ছতার আওতায় আনতে

হবে। ডিলারদের গোডাউন থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সারের চলাচল ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম দ্বারা মনিটরিং করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, যেখানে সারের মজুদ, চাহিদা এবং বিতরণ সম্পর্কিত তথ্য রিয়েল টাইমে আপলোড হবে। এই ব্যবস্থা সিন্ডিকেটকে অবৈধ মজদ ও কালোবাজারি

করার সুযোগ দেবে না। স্থানীয় প্রশাসন ও গণপ্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা

ইউনিয়ন ও উপজেলা স্তরে সার বিতরণ কার্যক্রমকে স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার

এবং কৃষি কর্মকর্তাকে নিয়মিতভাবে সারের বাজার ও মজুদ পরিদর্শনের দায়িত্ব দিতে হবে। কৃষকের চাহিদার সঠিক হিসাব রাখার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট এড়ানো সম্ভব। প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষকদের সমন্বয়ে একটি ‘মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে, যারা ডিলারের কার্যক্রম সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করবে।

মূল্য নির্ধারণ, সহায়তা ও কঠোর শাস্তি

সরকারি দামে সার নিশ্চিত করতে হবে। ডিলারদের অনিয়ম ও অমিল দমনে অবিলম্বে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে, সরকারের উচিত ‘কৃষক কার্ড’ বা ‘সরাসরি নগদ সহায়তা’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সারের ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌছানোর ব্যবস্থা করা, যাতে ডিলার বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে মূল্য

কারসাজির সুযোগ বন্ধ হয়। প্রযুক্তি ও বিকল্প ব্যবস্থাপনার প্রসার

কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ‘খামারি অ্যাপ’ বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের সারের সঠিক ব্যবহার, প্রয়োগের নিয়ম, এবং বাজারের মূল্য সম্পর্কে সহজে তথ্য ও সহায়তা পৌছানো যেতে পারে। পাশাপাশি, সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব সার এবং সমন্বিত উদ্ভিদ পুষ্টি ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে হবে। আধুনিক সেচ ব্যবস্থা যেমন ড্রিপ ইরিগেশন ব্যবহারে উৎসাহিত করে সারের অপচয় ও অতিরিক্ত ব্যবহার

কমানো সম্ভব। কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি ও গণমাধ্যমের ব্যবহার

সার প্রয়োগের সঠিক নিয়ম, ফসলের চাহিদা ও পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সার ব্যবহারের কৌশল সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করা প্রয়োজন। মিডিয়া, কৃষি বিভাগ এবং স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের যৌথভাবে কাজ করে তথ্য দ্রুত ও খোলাখুলিভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সারের ন্যায্যমূল্য ও প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমে প্রচার এবং কৃষক সমাবেশ আয়োজন করা জরুরি

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে এই সত্যটি আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারের কারসাজি আজ কেবল একটি বাণিজ্যিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর হুমকি। এখনই সময় কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা, সাপ্লাই চেইনকে নিয়ন্ত্রণ করা, কৃষকের পক্ষে কাজ করা এবং মাঠ পর্যায়ে তাদের সহায়তা নিশ্চিত করা। সারের কালোবাজারি ও কারসাজি রোধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আজকের এই ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। সারের কারসাজি রোধ হোক আজই।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া kobishafayat@gmail.com

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!