বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পরমতসহিষ্ণুতা ইসলামের সৌন্দর্য

Author

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন , কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৮৬ বার

পরমতসহিষ্ণুতা ইসলামের সৌন্দর্য

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

ইসলাম একটি শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার, সহানুভূতি, সৌহার্দ ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করা। এই মহান আদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরমতসহিষ্ণুতা। ভিন্ন ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান, ন্যায় ও সৌজন্যপূর্ণ আচরণ ইসলাম এই শিক্ষাই দিয়েছে যুগে যুগে। পরমতসহিষ্ণুতা বলতে বোঝায় নিজের বিশ্বাদে দৃঢ় থাকা সত্ত্বেও অন্যের বিশ্বাস ও মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, জুলুম ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়া। ইসলাম কখনোই জোরপূর্বক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেয়নি, বরং বিবেকের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘ধর্ম বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ স্পষ্টভাবে ভ্রান্ত পথ থেকে পৃথক হয়ে গেছে’ (সুরা বাকারা: ২৫৬)। এই আয়াত ইসলামের পরমতসহিষ্ণুতার মূল ভিত্তি। এখানে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ঈমান গ্রহণ হবে স্বেচ্ছায় ও আন্তরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে, জোর করে নয়। ইসলাম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে ন্যায় ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন’ (সুরা মুমতাহিনা : ৮)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে ইসলাম অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক, মানবিক আচরণ ও ন্যায়বিচারকে উৎসাহিত করে।

ধর্মীয় ভিন্নতা কখনোই মানবিক অধিকারের পথে বাধা হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন পরমতসহিষ্ণুতার সর্বোচ্চ বাস্তব দৃষ্টান্ত। মদিনায় হিজরতের পর তিনি মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন, যেখানে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ইতিহাসে এটি ধর্মীয় সহনশীলতার এক উজ্জ্বল দলিল। একবার এক ইহুদির মরদেহ পাশ দিয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা) সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান। সাহাবিরা বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, তিনি তো একজন ইহুদি। উত্তরে তিনি বললেন, সে কি মানুষ ছিল না’ (বুখারি, হাদিস: ১৩১২)। এই হাদিস ইসলামের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

ধর্ম ভিন্ন হলেও মানুষ হিসেবে মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। ইসলাম মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক বলে স্বীকার করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তোমার রব চাইতেন, তবে তিনি মানুষকে এক উম্মতই বানাতেন। কিন্তু তারা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে’ (সুরা হুদ ১১৮)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে মতভিন্নতা আল্লাহর ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত একটি বাস্তবতা। তাই ভিন্ন মতের কারণে ঘৃণা, সহিংসতা বা জুলুম ইসলামসম্মত নয়। পরমতসহিষ্ণুতার অর্থ এই নয় যে একজন মুসলমান নিজের আকিদা থেকে সরে যাবে। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয় নিজ বিশ্বাসে অবিচল থেকে প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে সত্যের দাওয়াত দিতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমার রবের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে’ (সুরা নাহল: ১২৫)। এই দাওয়াত হবে শালীন ভাষায়, যুক্তির মাধ্যমে, গালিগালাজ বা অপমান ছাড়া। আজকের বিশ্বে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ইসলামের পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই অন্যের বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে না, অন্যায় আচরণ করে না কিংবা জুলুমকে সমর্থন করে না। বরং সে ন্যায়, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। পরমতসহিষ্ণুতা ইসলামের কোনো আপসকামী দিক নয়, বরং এটি ইসলামের শক্তি ও সৌন্দর্যের প্রকাশ। এই শিক্ষাই মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখায় এবং সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ প্রশস্ত করে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ইসলামের এই মহান গুণ বাস্তব জীবনে ধারণ করার তওফিক দান করুন।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!