সার নিয়ে কারসাজি, কৃষক যাবে কোথায়

সার নিয়ে কারসাজি, কৃষক যাবে কোথায়
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
বাংলাদের কৃষি-অর্থনীতিতে সার কেবল একটি রাসায়নিক উপাদান নয়, এটি কোটি কোটি কৃষকের জীবনের নিশ্চয়তা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। প্রতিটি ফসলের নিবিড় পরিচর্যায় সারের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার ফলন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
ফসল রোপণ থেকে শুরু করে ফলন তোলার আগ পর্যন্ত, নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হয়ে পড়ে অসম্ভব। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কৃষি খাতে সারের সরবরাহব্যবস্থায় এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাঠে পর্যাপ্ত সরবরাহ, এমনকি সরকারি গুদামে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা প্রায়শই সঠিক সময়ে বা সরকারের নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। এই বৈপরীত্যের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে এক কৃত্রিম সংকট’, যার পেছনে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত চক্রান্ত। এই সিন্ডিকেটের মূল উদ্দেশ্য হলো, বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে বাজারদর বৃদ্ধি করা এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া। এই কারসাজির কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঋণের বোঝা বেড়ে যাচ্ছে এবং সার্বিকভাবে দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারি তথ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশে সারের কোনো ধরনের অভাব নেই। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন নিয়মিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে সারা দেশে তাদের চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ নিশ্চিত করেছে। চলতি মৌসুমে সরকারের পক্ষ
থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় কাতার, সৌদি আরব, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষাধিক টন সার আমদানি অনুমোদন করা হয়েছে, যা মজুতকে আরো শক্তিশালী করেছে। ভর্তুকি মূল্যে এই সার কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করে। তবে কাগজে-কলমে এই সাপ্লাই চেইন যতটা ত্রুটিমুক্ত ও মজবুত, মাঠ পর্যায়ে এর চিত্র ঠিক ততটাই ভিন্ন ও হতাশাজনক।
কৃষকরা প্রায়শই অভিযোগ করছেন যে, ডিলারদের গোডাউনে সার থাকলেও তারা নানা অজুহাতে ঠিক সময়ে তা বিক্রি করছেন না, আবার বিক্রি করলেও সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা
সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এই চিত্র উঠে এসেছে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডিলারদের একাংশ সরকারি দামে বিক্রয় না করে সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং পরবর্তীকালে কালোবাজারে তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে তা বিক্রি করছে। এতে
স্পষ্ট হয়, সমস্যা কেবল সরবরাহজনিত নয়, বরং এটি বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত অপচেষ্টা এবং আর্থিক দুর্বৃত্তায়ন।
এই কারসাজির ফলে কৃষকের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারা। ফসলের জীবনচক্রে একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে, যখন সারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তবে সারের ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদনখরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে ফসলহানির ঝুঁকিও।
অনেক ক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণ করে সার কেনেন। এতে করে সারের দাম বাড়লে তাদের ঋণের পরিমাণ বাড়ে এবং ফলন কমলে সেই ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এই চক্রটি গ্রামের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে
তোলে। শুধু সারের ক্ষেত্রে নয়, খামারিরা বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি ইনপুটের ক্ষেত্রেও একই সিন্ডিকেটেড ভোগান্তির শিকার হন। এই প্রবণতা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।
মনে রাখতে হবে, সারের কারসাজির ফলে কৃষকের উৎপাদন কমে গেলে এর ঢেউ সরাসরি দেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ বাজারে এসে আঘাত করে। উৎপাদন হ্রাস মানেই বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া, যার অনিবার্য পরিণতি হলো খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে চাল, আলু বা নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দামের লাগামহীন উর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ, সার্বিক ফলাফলে সারসংকট কৃষকের জন্য কেবল অর্থনৈতিক ভোগান্তিই নিয়ে আসে না, এটি একটি মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি করে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সরকার যখন ‘প্রচুর স্টক রয়েছে’ দাবি করে, তখন মাঠ পর্যায়ে সারের জন্য কৃষকের হাহাকার প্রমাণ করে যে, সরকারের ভর্তুকির অর্থ সঠিক পথে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এই ভর্তুকি লিকেজ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ও ঘটাচ্ছে। এই সমস্যা যদি দ্রুত সমাধান না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানি-নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।
এমতাবস্থায়, কৃষককে বাঁচাতে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সাপ্লাই চেইন স্বচ্ছ এবং ডিজিটাল মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে। সার ডিলারদের কার্যক্রমকে শতভাগ স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। সর্বোপরি, সারের কালোবাজারি ও কারসাজি রোধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

