বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

রেশমের শহর আর পদ্মার চরে অনন্য বিকেল

Author

মোঃ মাজহারুল ইসলাম , সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ২৯ বার

ইতিহাস, রেশম আর পদ্মার চরে এক অনন্য বিকেল

 

 

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে একটি মিনি মাইক্রোবাসে চড়ে রওনা হলাম আমরা দশ বন্ধু আতিক, কামরুল, ইব্রাহিম, তাওহিদ, খাদিজা, মিফতাহুল, সাদিক, সাদিয়া, তানজিম আর আমি। গন্তব্য রেশমের শহর রাজশাহী। গন্তব্য নির্দিষ্ট, তবু মনের ভেতরে এক অজানা প্রত্যাশা শুধু ঘোরা নয়, কিছু একটা দেখা কিছু একটা অনুভব করা। সেই প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি।

 

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

 

রাজশাহী পৌঁছে প্রথমেই গেলাম বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। শহরের হেতেম খাঁ এলাকায় অবস্থিত এই জাদুঘর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা হিসেবে স্বীকৃত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় একটি সাধারণ ভবন। কিন্তু ভেতরে পা দিতেই চোখে পড়ল ভিন্ন এক জগৎ।শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইতিহাস যেন নিঃশব্দে সাজানো রয়েছে। পাল, সেন, মৌর্য ও গুপ্ত যুগের প্রাচীন নিদর্শন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি, পাথরের ভৈরব ও গঙ্গার প্রতিমা, মুঘল আমলের রৌপ্যমুদ্রা, গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা হাজারো নিদর্শনের এই সংগ্রহশালা সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয়।জাদুঘরের এক বৃদ্ধ কর্মচারী আমাদের নিয়ে গেলেন একটি বিশেষ গ্যালারিতে। কাচের আলমারিতে রাখা হাতে লেখা কোরআনের পাণ্ডুলিপি পাশে সাজানো আরবি ও ফারসি দলিলপত্র মুঘল আমলের নানা নিদর্শন ইসলামি রীতির ধাতব তৈজসপত্র। এক প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়িয়ে কর্মচারী জানালেন এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি ঐতিহাসিক রাজকীয় পত্রের অনুলিপি। তাওহিদ বলল এগুলো দেখলে মনে হয় ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

দেড় শতাব্দীর বিদ্যাপীঠ ও প্যারিস রোড

 

জাদুঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম রাজশাহী কলেজে। এ কলেজ আজ এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বহন করছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এই নিদর্শন দেড় শতাব্দী পেরিয়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেউ ছবি তুলল। এরপর পুরো কলেজটা ঘুরে দেখলাম।এরপর গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্যারিস রোড দেখতে। দুপাশে সারি সারি গাছ মাঝখানে মসৃণ পথ হালকা হাওয়া। ছায়াঘেরা এই পথ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।

 

চিড়িয়াখানা

 

দুপুরে গেলাম রাজশাহী কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানায়। পদ্মার তীর ঘেঁষা এই চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই মন ভালো হয়ে গেল। ক্লান্ত হলেও পুরো চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখলাম এরপরে সবাই মিলে একসঙ্গে ক্যামেরাবন্দি হলাম। ক্লান্তি ছিল কিন্তু আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি।

 

সপুরা সিল্ক ফ্যাক্টরি

 

বিকেলে গেলাম সপুরা সিল্ক ফ্যাক্টরিতে। রাজশাহীকে বলা হয় সিল্ক সিটি । তাই এখানে না এলে এ শহরকে পুরোপুরি অনুভব করা যায় না। সপুরা সিল্ক মিলসে পা রাখতেই এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ কর্মচারী। বয়সের ভাঁজ পড়া মুখে প্রশান্তির হাসি, চোখে দশকের অভিজ্ঞতা। তিনি আমাদের নিয়ে ঘুরলেন ঘর থেকে ঘরে দেখালেন কীভাবে তুঁতপাতা থেকে রেশমগুটি হয় সেই গুটি থেকে কীভাবে টানা হয় সুতা আর সেই সুতা থেকে কীভাবে জন্ম নেয় মসৃণ শাড়ি। এ অঞ্চলে রেশম চাষের ইতিহাস সুদীর্ঘ।রঙিন শাড়ি, পাঞ্জাবি ও রেশমের কাপড় সাজানো শোরুমে সাদিয়া আর খাদিজা বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল। আতিক বলল এই সিল্ক পরলে গায়ে কেমন একটা রাজকীয় অনুভূতি হয়। রাজশাহী সিল্ক এখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত এ গর্বটুকু শোরুমের প্রতিটি কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে।

 

পদ্মায় নৌকাভ্রমণ ও মাগরিবের নামাজ

 

বিকেলের শেষ আলো যখন পদ্মার বুকে ছড়িয়ে পড়েছে তখন গেলাম টি-বাঁধে। নৌকা ভাড়া করে এগিয়ে গেলাম চরের দিকে। নদীর বুকে জেগে ওঠা সেই চরে নেমে কিছুক্ষণ ঘুরলাম পায়ের নিচে নরম বালু চারদিকে শুধু নদী আর আকাশ। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে সেই নির্জনতায় নিজেকে অন্যরকম হালকা মনে হলো। পদ্মায় সূর্যাস্তের দৃশ্য সবার মন কেড়ে নিল।মাগরিবের নামাজের সময় হলে চরের পাশে নোঙর করা নৌকায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। একপাশে চরের নরম বালু অন্যপাশে পদ্মার স্রোত মাথার ওপর সন্ধ্যার লাল আকাশ সাক্ষী রেখে আদায় হলো মাগরিবের নামাজ। এমন নামাজের অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।

 

স্বাদে যে শহরকে চেনা যায়

 

তীরে ফিরে বসলাম একটি পুরনো দোকানে। রাজশাহীর বিখ্যাত কালাই রুটি না খেলে এই ভ্রমণ পুরোপুরি হতো না। লাল শুকনো মরিচে কষানো হাঁসের কালাভুনার সঙ্গে মাটির তাওয়ায় সেঁকা গরম কালাই রুটি প্রথম কামড়েই বুঝলাম কেন এই খাবারের এত নাম। সাদিক বলল এই স্বাদের কথা বলে বোঝানো যাবে না নিজে এসে খেতে হবে।

 

নাটোরের কাঁচাগোল্লা

 

ফেরার পথে থামলাম নাটোরে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বনলতা সেনের সেই নাটোরে এসে কাঁচাগোল্লা না খেলে ভ্রমণের তৃপ্তি অসম্পূর্ণ থেকে যেত। রেস্তোরাঁয় বসে কাঁচাগোল্লা মুখে দিতেই মিষ্টি গলে গেল এমন মোলায়েম এমন টাটকা স্বাদ। আমরা দশজনই নিজের জন্য পরিবারের জন্য প্যাকেট কিনলাম।

ফেরার পথে বাইরে তখন গভীর রাত। মাইক্রোবাসের ভেতরে চলছিল গান আলোচনা আর ভ্রমণের তৃপ্তির হিসাব। একটি দিন একটি শহর পদ্মার চরে একটি নামাজ ‌সব‌কিছু স্মৃতি‌ হয়ে থাকবে। সময়ের সঙ্গে ম্লান হবে না বরং আরও উজ্জ্বল হবে।

 

 

নাম: মোঃ মাজহারুল ইসলাম

শিক্ষার্থী: সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক ‌জাগো নিউজ ২৪ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!