নগর কৃষি: ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন দিশা
https://epaper.banglabazarpatrika.net/edition/733/epaper-for-july-17-2026/page/4#
নগর কৃষি: ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন দিশা
ক্রমগত বর্ধনশীল নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি- এই বিষয়গুলি আজ বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় খাদ্য উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল গ্রামাঞ্চল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে শহরই হয়ে উঠছে মানুষের প্রধান আবাসস্থল। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্যমতে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বর্তমানে শহরে বাস করছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশে পৌঁছাবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে খাদ্যের সবচেয়ে বড় ভোক্তা হবে শহর। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য কোথা থেকে আসবে? এই সংকটের একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে নগর কৃষি। অর্থাৎ শহরের ভেতর বা আশপাশে ছাদ, বারান্দা, খালি জমি, বিদ্যালযয়ের আঙিনা, অফিস, কমিউনিটি স্পেস কিংবা বড় কাঠামো ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা করা। একসময় এটি ছিল শখের বিষয়; আজ এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই নগর উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক কৌশল। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) দীর্ঘদিন ধরে নগর ও শহরতলির কৃষিকে খাদ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। সংস্থাটির মতে, নগর কৃষি শুধু তাজা খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ায় না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে এবং সংকটকালে স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে সহায়তা করে। ২০১৯ সালের কোভিড-১৯ মহ-ামারির সময়কালীন এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। লকডাউন, পরিবহন সংকট এবং বাজারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বহু শহরে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। তখন অনেক পরিবার ছাদকৃষি, কিচেন গার্ডেন ও কমিউনিটি গার্ডেনের মাধ্যমে নিজেদের খাদ্যের একটি অংশ উৎপাদন করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নগর কৃষির গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের মোট কৃষিজমি প্রতিবছর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন ও আবাসন প্রকল্পের কারণে কমছে। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার মতো শহরে জনসংখ্যার চাপও বাড়ছে। প্রতিদিন এসব শহরে শত শত ট্রাক খাদ্যপণ্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবহন করতে হয়। এতে যেমন পরিবহন ব্যয় বাড়ে, তেমনি জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণও বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় পরিবহন বিলম্বের কারণে খাদ্যের অপচয় ঘটে। অথচ শহরের অসংখ্য ছাদ, বারান্দা ও অব্যবহৃত স্থান পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে স্থানীয় পর্যায়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল, শাকসবজি, উৎপাদন সম্ভব। নগর কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। বর্তমানে বাজারে বিক্রিত অনেক সবজি ও ফলে অতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। নিজের ছাদ বা বারান্দায় উৎপাদিত সবজিতে জৈব সার ও নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে পরিবার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পায়। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। শুধু খাদ্য উৎপাদন নয়, নগর কৃষি পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরে সবুজ অবকাঠামো বৃদ্ধি তাপদ্বীপ প্রভাব কমাতে, বৃষ্টির পানি ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে। ছাদকৃষি ভবনের ছাদে তাপ শোষণ কমায়, আশপাশের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস করে এবং নগরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখে। মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গের জন্যও এটি ক্ষুদ্র আবাসস্থল তৈরি করে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে নগর কৃষিকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ করেছে। সিঙ্গাপুর সীমিত জমির মধ্যেও উচ্চপ্রযুক্তির উল্লম্ব কৃষির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শাকসবজি উৎপাদন করছে। নেদারল্যান্ডস আধুনিক গ্রিনহাউস প্রযুক্তির সাহায্যে অল্প জমিতে সর্বোচ্চ উৎপাদনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। জাপানে কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ভবনের ভেতরে কৃষিকাজ পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বহু শহরে কমিউনিটি গার্ডেন এখন সামাজিক সংযোগ, শিক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশেও আশাব্যঞ্জক কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কৃ ষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় ছাদকৃষি সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) এর সহযোগিতায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে ছাদকৃষির প্রদর্শনী প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখানে শত শত পরিবার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সফলভাবে ছাদে সবজি ও ফল উৎপাদন করেছে। বর্তমানে অনেক পরিবার টবে টমেটো, মরিচ, বেগুন, লাউ, করলা, লেবু, পেঁপে, ধনিয়া, পুদিনা ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ চাষ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ছাদকৃষির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নগর কৃষির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। এটি পরিবারের খাদ্য ব্যয় কমায়, অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উৎপাদনশীল সম্পৃক্ততা এবং শিশুদের কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যালয়ে শিক্ষাবাগান বা ছাদকৃষি চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের পাশাপাশি হাতে-কলমে কৃষি শিক্ষা লাভ করবে। তবে নগর কৃষিকে আরও বিস্তৃত করতে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা জরুরি। অনেক ভবনের ছাদ কৃষির জন্য উপযোগী নয়, নিরাপদ সেচব্যবস্থা নেই, মানসম্মত বীজ ও জৈব সার সহজলভ্য নয় এবং অনেকেই আধু-নিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে জানেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভবনের কাঠামো অতিরিক্ত ওজন বহনের উপযোগী কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার, সিটি করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন ভবনের নকশায় ছাদকৃষির সুযোগ রাখা, কর প্রণোদনা দেওয়া, কমিউনিটি গার্ডেন প্রতিষ্ঠা, স্কুল-কলেজে নগর কৃষি শিক্ষা চালু করা এবং সহজ প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শহর উপযোগী উচ্চফলনশীল ও স্বল্পস্থানে চাষযোগ্য জাত উদ্ভাবনে গবেষণার পরিধিও বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু গ্রামীণ কৃষির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। খাদ্য উৎপাদনকে মানুষের বসবাসের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি খালি জায়গা এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিক এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারেন। নগর কৃষি কেবল কয়েকটি সবজি উৎপাদনের উদ্যোগ নয়; এটি একটি টেকসই নগরজীবন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং খাদ্যস্বনির্ভরতার দর্শন। আজ যদি আমরা নগরকে শুধু কংক্রিটের জঙ্গল হিসেবে না দেখে একটি উৎপাদনশীল সবুজ পরিসরে রূপান্তর করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ পরিবেশ এবং জলবায়ু সহনশীল শহর গড়ে তোলা সহজ হবে। নগরায়ণের সাথে সাথে আমাদের নগর কৃষিরও বিস্তার ঘটাতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন দিশা হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের শহরের ছাদ, বারান্দা ও ছোট্ট সবুজ বাগানেই।
