বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বৃক্ষরোপণ নয়, সংরক্ষণই বড় চ্যালেঞ্জ

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৫ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ৩৯ বার

https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-07-04&page=4&news=04_103

বৃক্ষরোপণ নয়, সংরক্ষণই বড় চ্যালেঞ্জ

ছয় ঋতুর অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস মিলে বর্ষাকাল। প্রতিবছর বর্ষাকাল এলেই দেশে নানা প্রান্তে শুরু হয় বৃক্ষরোপণ অভিযান। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও লাখ-লাখ চারা রোপণ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বৃক্ষরোপণের অসংখ্য ছবি। নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই গাছগুলোর কতটিই বা বেঁচে থাকে? কতটির-ই নিয়মিত পরিচর্যা হয়? কতটি গাছ পরিণত হয়ে সত্যিকার অর্থে পরিবেশের সম্পদে পরিণত হয়? এই প্রশ্নগুলো নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হলেও সময়ের প্রয়োজনে আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের অভাব নেই; অভাব রয়েছে বৃক্ষ সংরক্ষণের। ফলে প্রতি বছর নতুন করে গাছ লাগানো হলেও সবুজের পরিমাণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। বরং নগরায়ণ, অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে বহু পুরোনো ও পরিণত বৃক্ষ। একটি পরিণত বৃক্ষ যে পরিবেশগত সেবা প্রদান করে, তা শত শত নতুন চারাও বহু বছর ধরে দিতে পারে না। অথচ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রমের নামে সেই গাছ কেটে ফেলা হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক পরিণত গাছ কেবল-ই ছায়া দেয় না; এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, বৃষ্টির পানি মাটিতে ধরে রাখে, মাটিক্ষয় রোধ করে এবং অসংখ্য পাখি, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে একটি পুরোনো গাছের মূল্য কেবলই অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। তবু আমরা এমনভাবে গাছ কাটি যেন এগুলো শুধুমাত্র কাঠের উৎস। শহরাঞ্চলের দিকে তাকালে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। রাস্তা প্রশস্ত করা, উড়ালসড়ক নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প কিংবা বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইনের কাজের অজুহাতে অসংখ্য পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে কয়েকটি চারা লাগানো আগাছা পরিষ্কার করা, খুঁটি হলেও, সঠিক পরিচর্যার অভাবে সেগুলোর বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা থাকে না। একটি ৫০ বছরের পুরোনো বৃক্ষের পরিবর্তে দশটি চারা রোপণ করলেও সেই পরিবেশগত ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতির নিজস্ব একটি সময়চক্র রয়েছে, যা কেবল সংখ্যার হিসাব দিয়ে পূরণ হতে পারে না। গ্রামাঞ্চলেও বৃক্ষ সংরক্ষণের চিত্র যে খুব আশাব্যঞ্জক, তেমনটা নয়। কৃষিজমি সম্প্রসারণ, ইটভাটা, নতুন বসতি নির্মাণ কিংবা জ্বালানির প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও বহু গাছ বিলীন হয়ে যায়। এসব ক্ষতি পূরণে কার্যকর সংরক্ষণ কর্মসূচি খুব কমই আমরা দেখি। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো পরবর্তী পরিচর্যার অভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোপণের পর চারাগুলো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় নিয়ান পো দেওয়া। আগাছা পরিষ্কার দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া কিংবা পশুর হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক চারা মারা যায়। কিন্তু কাগজে-কলমে সেগুলো সফল বৃক্ষরোপণ হিসেবেই থেকে যায়। আমাদের দেশে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে লক্ষাধিক চারা রোপণের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু কত শতাংশ চারা এক বছর পর জীবিত থাকে, পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয় কিংবা দশ বছর পরও টিকে থাকে- এমন তথ্য খুব কমই প্রকাশ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও বন্যার মতো সমস্যার মোকাবিলায় বৃক্ষই সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। কংক্রিটের বিস্তার নগরের তাপমাত্রা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছগুলো রক্ষা করা আরো বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। বৃক্ষ সংরক্ষণকে কেবল বন বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক, সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সেখানে থাকা পুরোনো বৃক্ষ সংরক্ষণের বিকল্প পরিকল্পনা থাকা উচিত। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া পরিণত বৃক্ষ অপসারণ করা যাবে না। প্রয়োজনে প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। উন্নয়ন এবং পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি আইন প্রয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, নগর এলাকায় বৃক্ষের তালিকা তৈরি, গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো বৃক্ষকে সংরক্ষিত ঘোষণা এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শতবর্ষী বা ঐতিহাসিক বৃক্ষ বিশেষ আইনি সুরক্ষা পায়। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি গাছের অভিভাবক’- এ ধরনের কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু গাছ লাগাবে না; বরং সেটিকে বড় করে তোলার দায়িত্বও নেবে। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিচর্যা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সফলতা মূল্যায়ন করতে হবে জীবিত গাছের সংখ্যার ভিত্তিতে। প্রকৃতি আমাদের কাছে কেবল সম্পদ নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বেরও প্রধান ভিত্তি। একটি গাছ বড় হতে সময় লাগে বহু বছর, কিন্তু সেটি কাটতে লাগে মাত্র কয়েক মিনিট বা ঘণ্টা। তাই কেবল নতুন চারা রোপণ করলেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। যে বৃক্ষগুলো এরই মধ্যে আমাদের ছায়া দিচ্ছে, বাতাস বিশুদ্ধ করছে, জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলো রক্ষা করা বড় দায়িত্ব। আমরা যদি সত্যিই একটি সবুজ, বাসযোগ্য ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তবে বৃক্ষরোপণের সংখ্যার চেয়ে সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ নতুন গাছ লাগানো সহজ; কিন্তু একটি পরিণত বৃক্ষ সৃষ্টি করতে লাগে কয়েক দশক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটাই হবে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সবুজ উত্তরাধিকার।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!