মৌমাছি কমে গেলে কৃষিতে কী প্রভাব পড়বে?
https://epaper.banglabazarpatrika.net/edition/736/epaper-for-july-20-2026/page/4#
মৌমাছি কমে গেলে কৃষিতে কী প্রভাব পড়বে?
পৃথিবীতে এমনও অনেক প্রাণী আছে, যাদের উপস্থিতি আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। অথচ তাদের অনুপস্থিতি মানবসভ্যতার জন্য হয়তো ভয়াবহ সংকট ডেকে আনতে পারে। মৌমাছি তেমনই একটি প্রাণী। ছোট্ট এই পতঙ্গটি শুধু যে মধু উৎপাদন করে না; বরং কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর অধিকাংশ ফুলগাছ ও কৃষিজ ফসলের পরাগায়নের সঙ্গে মৌমাছির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই বিশ্বজুড়ে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মৌমাছি কমে গেলে কৃষির ভবিষ্যৎ কী হবে? কৃষিতে মৌমাছির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো- পরাগায়ন। একটি ফুলের পুংকেশর থেকে স্ত্রীকেশরে পরাগরেণু স্থানান্তরের মাধ্যমে ফল, বীজ ও নতুন উদ্ভিদ জন্ম লাভ করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে মৌমাছিরা। ফুল থেকে মধু ও পরাগ সংগ্রহের সময় তাদের শরীরে পরাগরেণু লেগে যায় এবং এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যাওয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে পরাগায়ন ঘটে। ফলে ফসলের ফলন বাড়ে, ফলের আকার ও গুণগত মান উন্নত হয় এবং বীজ উৎপাদন নিশ্চিত হয়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ এমন ফসলের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর পরাগায়নে মৌমাছিসহ বিভিন্ন ধরনের পরাগবাহীর ভূমিকা রয়েছে। ফল, শাকসবজি, তেলবীজ, ডাল, বাদাম এবং বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদন মৌমাছির কার্যক্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে শুধু মধুর উৎপাদন নয়, খাদ্য উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বাংলাদেশের কৃষিও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে সরিষা, সূর্যমুখী, তিল, ধনিয়া, জিরা, বিভিন্ন ডালজাতীয় ফসল, লাউ, কুমড়া, শসা, তরমুজ, বেগুন, মরিচ, টমেটো, আম, লিচু, পেয়ারা, কমলালেবুসহ অসংখ্য ফসলের উৎপাদনে মৌমাছির পরাগায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক কৃষক বর্তমানে সরিষা ও ফলের বাগানে মৌচাক স্থাপন করে ফলন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন।বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন নিশ্চিত হলে অনেক ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং ফলের মানও উন্নত হয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে মৌমাছির সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অতিরিক্ত ও নির্বিচারে কীটনাশকের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, একফসলি কৃষির বিস্তার, দূষণ এবং বিভিন্ন রোগ ও পরজীবীর আক্রমণ মৌমাছির অস্তিত্বকে ক্রমশ হুমকির মুখে ফেলছে। ফুলগাছ কমে যাওয়ায় মৌমাছির খাদ্যের উৎসও সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাসায়নিক কীটনাশক মৌমাছির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি। অনেক কীটনাশক মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। ফলে তারা খাদ্য সংগ্রহের পথ ভুলে যায়, মৌচাকে ফিরে যেতে পারে না অথবা অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার শেষ পর্যন্ত কৃষিরই ক্ষতির কারণ হয়ে উঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মৌমাছির জীবনচক্রে দেখা যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তনের কারণে ফুল ফোটার সময় ও মৌমাছির সক্রিয়তার মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ফুল ফোটার সময় পর্যাপ্ত পরাগবাহী মৌমাছি পাওয়া যায় না, যা সরাসরি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। Intergovernmental Science-Policy Platform on Biodiversity and Ecosystem Services- এর বৈশ্বিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের বহু প্রজাতির পরাগবাহী পতঙ্গ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং খাদ্যনিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষকের উৎপাদন। পরাগায়ন কম হলে ফুল ঝরে পড়বে, ফলের সংখ্যা কমবে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফলের আকারও ছোট হবে। ফলন কমে গেলে কৃষকের আয় কমবে, উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কমে যাবে এবং বাজারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ হ্রাস পাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও পড়বে। ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুষ্টি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। ফল ও শাকসবজি মানুষের ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যদি এসব ফসলের উৎপাদন কমে যায়, তাহলে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। মৌমাছির সংকট জীববৈচিত্র্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে। বুনো উদ্ভিদের একটি বড় অংশও পরাগায়নের জন্য মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। এসব উদ্ভিদের সংখ্যা কমতে থাকলে খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হবে এবং পাখি, প্রজাপতি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংকুচিত হবে। অর্থাৎ একটি ছোট পতঙ্গের সংকট ধীরে ধীরে পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে এই সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কী-টনাশকের নিরাপদ ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ব্যবহার কমে। কৃষিজমির আশপাশে ফুলগাছ ও দেশীয় উদ্ভিদ রোপণ করে মৌমাছির জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মৌমাছি পালনকে একটি সম্ভাবনাময় কৃষি-উদ্যোগ হিসেবে উৎসাহিত করতে হবে। এতে একদিকে মধু উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে পরাগায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। তাই মৌমাছি সংরক্ষণকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং কৃষি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখতে হবে। ছোট্ট একটি পতঙ্গ মৌমাছি হয়তো আমাদের চোখে খুব সাধারণ একটি প্রাণী। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এদের অবদান অসাধারণ। মৌমাছি কমে যাওয়া মানে শুধু একটি পতঙ্গের সংখ্যা কমে যাওয়া নয়; বরং কৃ যি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ওপর এক নীরব সংকটের সূচনা। তাই মৌমাছি রক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের কৃষি রক্ষা করা, খাদ্য রক্ষা করা এবং মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা।
