পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব বাড়ছে
https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-07-11&page=4&news=04_103
পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব বাড়ছে
অতীতে একটি পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সুঅভিজ্ঞতা ছিল সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি, আর তরুণদের দায়িত্ব ছিল প্রবীণদের দেখানো পথ অনুসরণ করা। এখন সেই চিত্র পাল্টেছে। একই ছাদের নিচে থেকেও মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে কথোপকথন কমছে। কোথাও বা দাদু-দিদা বা ঠাকুমা-ঠাকুরদার সঙ্গে নাতি-নাতনিদের মানসিক সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে থাকলেও যেন প্রত্যেকে আলাদা এক জগতে বাস করছেন। প্রযুক্তি, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও প্রত্যাশার পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে সমাজের প্রধান ভিত্তি পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব আজ একটি বাস্তব সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রজন্মগত দূরত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিটি যুগেই নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্ম থেকে কিছুটা ভিন্নভাবে চিন্তা করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা অনেক সময় পরবর্তী প্রজন্মের বাস্তবতার সঙ্গে আর খাপ খায় না। ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গায় ভুল বোঝাবুঝি, সংলাপের জায়গায় নীরবতা এবং সহমর্মিতার জায়গায় বিরক্তি তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্বের সবচেয়ে বড় কারণ প্রযুক্তিনির্ভর জীবন। আজকের শিশুরা জন্ম পরবর্তী সময় থেকেই স্মার্টফোন হাতে বড় হচ্ছে। ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভার্চুয়াল সম্মেলনে তৈরি হচ্ছে নতুন অনলাইন জগৎ। অন্যদিকে তাদের মা-বাবা বা দাদু-দিদিমার শৈশব কেটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। ফলে একই ঘটনার ব্যাখ্যা দুই প্রজন্মের কাছে ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তরুণদের কাছে অনলাইন শিক্ষা, দূরবর্তী কাজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্বাভাবিক বিষয় হলেও অনেক অভিভাবকের কাছে এগুলো এখনো বিরক্তিকর। প্রযুক্তির এই ব্যবধান ধীরে ধীরে মানসিক ব্যবধানকেও প্রসারিত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই দূরত্বকে বাড়িয়ে তুলছে। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। একসময় রাতের খাবারের টেবিল ছিল দিনের শেষে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির জায়গা। এখন সেখানে দেখা যায় নীরবতা। বাস্তব কথোপকথনের পরিবর্তে ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাড়ছে। ফলে সম্পর্কের গভীরতা কমছে, অথচ সংযোগের সংখ্যা বাড়ছে। যোগাযোগের মাধ্যম যত আধুনিক হচ্ছে, আন্তরিক যোগাযোগ ততই সংকুচিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। বর্তমান সময়ে মা-বাবা উভয়েই কর্মজীবী হওয়া ক্রমেই সাধারণ বাস্তবতা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সব মিলিয়ে পরিবারের জন্য সময় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে সন্তানেরাও স্কুল, কোচিং, অনলাইন ক্লাস ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যস্ত। ফলে একই পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাটানো সময় আগের তুলনায় অনেক কমেছে। সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয় সময়, মনোযোগ ও আলাপের মাধ্যমে; যখন এগুলো কমে যায়, তখন দূরত্ব বাড়ে। মূল্যবোধ ও প্রত্যাশার পরিবর্তনও প্রজন্মগত ব্যবধানের আরেকটি বড় কারণ। আগের প্রজনন্ম স্থিতিশীল চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে বেশি গুরুত্ব দিত। বর্তমান প্রজন্ম ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানসিক সুস্থতা, সৃজনশীলতা এবং পছন্দের পেশাকে বেশি মূল্য দেয়। এই দিন দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় পারিবারিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। অনেক অভিভাবক এখনো মনে করেন, সফলতা মানেই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিসিএস ক্যাডার হওয়া। অথচ নতুন প্রজন্মের কেউ হয়তো তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা সৃজনশীল পেশায় নিজেকে দাঁড় করাতে চান। পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে এই পার্থক্য সংঘাতে রূপ নেয়। পরিবারের কাঠামোগত পরিবর্তনও এখানে ভূমিকা রাখছে। একসময় যৌথ পরিবারে শিশুরা বিভিন্ন বয়সি মানুষের সঙ্গে বেড়ে উঠত। দাদু-দিদিমা, কাকা-কাকির সঙ্গে প্রতিদিনের মেলামেশা থেকে তারা অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও পারিবারিক ঐতিহ্য শিখত। বর্তমানে নগরায়ণ ও কর্মসংস্থানের কারণে একক পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে প্রজন্মের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগও কমে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তরুণরা বিশ্বের নানা দেশের সংস্কৃতি, মতাদর্শ ও জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে শিখছে, মত প্রকাশে সাহসী হচ্ছে এবং সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা চাইছে। প্রজন্মগত দূরত্বের প্রভাব শুধু পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যখন পরিবারের সদস্যরা একে অপরের অনুভূতি বুঝতে ব্যর্থ হয়, তখন একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও পারিবারিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। অনেক তরুণ-তরুণী এখন নিজের সমস্যার কথা পরিবারের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বাইরের মানুষের কাছে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আবার অনেক প্রবীণ মনে করেন, তাদের অভিজ্ঞতার আর কোনো মূল্য নেই। এই বিচ্ছিন্নতা সামাজিক সংহতিকেও ক্রমশ দুর্বল করে। তবে এই কৃত্তিম সংকটের সমাধানও সম্ভব। প্রথমত, পরিবারে পুনরায় সংলাপের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। সন্তানকে শুধু উপদেশ নয়, মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে তরুণদেরও বুঝতে হবে যে অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা জীবনের দীর্ঘ পথচলার ফসল। দ্বিতীয়ত, পরিবারে প্রযুক্তির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় মোবাইল বা অন্য ডিজিটাল ডিভাইস ছাড়া একসঙ্গে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, গল্প করা, বই নিয়ে আলোচনা বা ছোট্ট পারিবারিক ভ্রমণ, এসব সম্পর্ককে দৃঢ় করে। তৃতীয়ত, অভিভাবকদেরও পরিবর্তিত সময় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে। নতুন প্রযুক্তি, নতুন পেশা কিংবা নতুন প্রজন্মের মানসিক চাহিদা সম্পর্কে ধারণা থাকলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। একইভাবে তরুণদেরও পরিবারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। পারস্পরিক শেখার মানসিকতাই প্রজন্মগত দূরত্ব কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পরিবার শুধুমাএ রক্তের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মান ও বোঝাপড়ার একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তি, আধুনিকতা কিংবা সময়ের পরিবর্তন এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে দুর্বল করে না, যদি পরিবারে আন্তরিক সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় থাকে। প্রজন্মের পার্থক্য স্বাভাবিক, আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই পার্থক্য যেন দূরত্বে পরিণত না হয়। কারণ যে পরিবারে এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে বুঝতে শেখে, সেই পরিবারই ভবিষ্যতের সুস্থ, মানবিক ও সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
