কঠোরতার আড়ালে কোমল হৃদয়
সাবিহা তারান্নুম মিম: আমার কাছে বাবা প্রথমে একজন শিক্ষক। তিনি আমার মেন্টর, আমার পথপ্রদর্শক। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে অতিরিক্ত ভয় পাওয়া আমি, এখন সময় পেরিয়ে বয়স বেড়ে বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছি। ছোট্ট এ জীবনে বাবাকে প্রায়ই বলি, তাকে আমি ভালোবাসি। আমার বাবা জানেন, তার বড় মেয়ে তাকে কতটা ভালোবাসে। শুধু হয়তো জানেন না, তাকে আমি দুর্বল হতে দেখতে পারি না, তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতে পারি না। ছোটবেলা থেকেই বাবার কড়া শাসনে বড় হওয়ার গল্প কমবেশি সবাই জানে। জানে না আমার বাবার শাসনের আড়ালে থাকা অদৃশ্য ভালোবাসার কথা। বাবা আমার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। শৈশবে বাবাকে সব সময় দেখেছি রাগী, গম্ভীর এবং কঠোর একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু সেই বাবাকে যখন জীবনের প্রথম বার কাঁদতে দেখেছি, তখন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল আমার পুরো পৃথিবী। তখন উপলব্ধি করেছিলাম সবচেয়ে শক্ত মানুষ হিসেবে আমার বাবাও কাঁদতে জানে এবং আমার সেটা সহ্য হচ্ছে না। আমি কখনো সেদিনকে ভুলতে পারবো না। এই স্মৃতি আমার মানসপটে আজও গেঁথে রয়েছে। সত্য কথা বলার সাহস, অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শিক্ষা এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার মূল্য এসব বোঝার ভিত্তি তৈরি করেছেন আমার বাবা। জীবনে যদি আমার দায়িত্ববোধ, সততা কিংবা ন্যায়ের পথে চলার মানসিকতা থেকে থাকে তার বড় অংশের কৃতিত্ব আমার বাবার। তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখিয়েছেন জীবনে সত্যের পথ সহজ না হলেও সম্মানজনক। আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হলো আমার বাবা। বাবার দৃঢ়তা, কঠোর চোখের ভাষা আর আচরণের শৃঙ্খলা শৈশবে মনঃপুত না হলেও এখন এর গুরুত্ব বুঝি। ছোটবেলায় অনেকটা সময় কেটে গেছে শুধু বাবাকে ভয় পেয়ে। বাবার প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা আমাকে এই যুগের অনেক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে এক অদৃশ্য রক্ষাকবচের মতো। আমি বাবার জীবন থেকে শিখেছি পরিশ্রমের গুরুত্ব আর দায়িত্ববোধের মূল্যবোধ। আমার বাবা সহজে অনুভূতি প্রকাশ করেন না। তিনি কখনো প্রকাশের প্রয়োজনই বোধ করেন না। কিন্তু তার প্রতিটি ত্যাগ, দুশ্চিন্তাই তার ভালোবাসারই প্রতীক। বাবা দিবস তাই শুধু ভালোবাসা প্রকাশের দিবস নয়, এটি আমার কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিন। আগে যেই বাবার এক ডাকে ভয়ে কথা গোছানো শুরু করতাম, আর আজ সেই বাবার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতে থাকি।
পৃথিবীর সকল সম্পর্কই জানে স্বার্থের হিসাব, কিন্তু বাবার যত্ন আর স্নেহ জানে না কোনো হিসাব। আমার জীবনে এক ও অদ্বিতীয় স্বপ্ন বাবাকে সম্মানিত করা। এক সময় যে বাবার গম্ভীর মুখটাই যথেষ্ট ছিল আমাকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য। কিন্তু আজ জীবনে এতটা পথ এসে বাবাকে উপলব্ধি করেছি নতুনভাবে। আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম সমালোচক আর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বাবা। বাবাদের ত্যাগের গল্পগুলো অনেক সময় বলা হয় না। কিন্তু সেই গল্পের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে সন্তানের স্বপ্ন। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবারা।
সাবিহা তারান্নুম মিম
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
