বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সংঘাতে পিষ্ট তৃতীয় বিশ্ব

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ পাঠ: ৩৪ বার

সাবিহা তারান্নুম মিম:   বিশ্বের চলমান নানা সংঘাত কিংবা ঐতিহাসিক সকল যুদ্ধের প্রাণভোমরা আধিপত্য বিস্তার করা। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কালে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বড় বড় পরাশক্তিধর দেশগুলো ক্ষমতা বিস্তার করে থাকতো। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্র। আজকের বিশ্বে সামরিক শক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য খাত নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে। অর্থনৈতিক যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বে তুলনামূলক অধিক ব্যবহৃত ও সমাদৃত। মূলত বড় শক্তিধর দেশগুলোর মূল লক্ষ্যই থাকে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলা। সেই লক্ষ্যে আমদানি বন্ধ করা, প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা সহ বিনিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যা মূলত প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে ব্যবহৃত। এ ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি নিখুঁত উপায়। একটি দেশের উপর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা এজাতীয় কোন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নীতি বা আচরণ পরিবর্তনের জন্য অন্য দেশগুলো যে চাপ সৃষ্টি করে তা হলো স্যাংশন। পরাশক্তিধর দেশগুলো মূলত অন্য দেশের ওপর নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের নীতি ব্যবহার করে। রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়াও যুদ্ধ বা শক্তিশালী রাষ্ট্রের আগ্রাসন মনোভাব প্রতিরোধ করতেও এই নীতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে। অপরদিকে, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার জবাবে দেশটি যদি পাল্টা বিভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে থাকে তবে তাকে বলা হয় কাউন্টার স্যাংশন। অর্থাৎ আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ। কিন্তু একাধিক পরাশক্তি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো যদি সংঘাত দীর্ঘদিন চলমান রাখে তবে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তৃতীয় বিশ্বে। স্যাংশন বা কাউন্টার স্যাংশন এর ফলশ্রুতিতে যখন নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা প্রকট রূপ ধারণ করে তখন সরাসরি অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। সাম্প্রতিককালে ইরান ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সংঘাতের প্রভাবে দীর্ঘদিন অস্থিতিশীল ছিল জ্বালানির বাজার কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন সহ প্রয়োজন অনুপাতে সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায় মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির তীব্র সংকট। অর্থাৎ ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় উন্মত্ত হয়ে অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তখন সংঘাতের মূল্য চুকিয়ে থাকে দুর্বল দেশগুলো। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার স্যাংশন এবং কাউন্টার স্যাংশন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি বড় অস্ত্র। পাল্টা মুখোমুখি অবস্থানে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর অস্থিরতার পিষ্ট হয় তৃতীয় বিশ্ব। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো অনিশ্চয়তার দহনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ফলে ধোঁয়াশায় হারিয়ে যায় বিশ্বের পিছিয়ে পড়া এই দেশগুলোর অগ্রগতি। বাংলাদেশের মতো একটি মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশও এই ঝড়ের কবলে নিপতিত হয়ে থাকে। ফলে বিশ্ব ভূ রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে অধিক মনোযোগী হতে হবে। কৌশলগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। মূলত দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের আমদানি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সহযোগিতাপূর্ণ আস্থাশীল সম্পর্ক অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের গতিতে তাই জ্বালানি ও খাদ্যে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে। যাতে দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই ঔষধ, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। যা দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী অর্থনীতি করতে সহায়ক। এছাড়াও একটি দেশের আর্থিক নিরাপত্তার বর্ম রিজার্ভ সংকটকালীন পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করতে ভূমিকা রাখে। তাই সরকারকে রিজার্ভ শক্তিশালী করতে মনোযোগী হতে হবে। যা বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জনে অপরিহার্য। বিশ্বব্যবস্থা সময়ের সাথে চলমান ও গতিশীল প্রক্রিয়া। অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ব্যবস্থায় স্যাংশন বা কাউন্টার স্যাংশন এর কার্যকারিতা ও প্রভাব বদলাতে পারে। ফলে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার শক্তিশালী অস্ত্র অর্থনৈতিক যুদ্ধের প্রয়োগ ও প্রভাব ভূ রাজনৈতিক স্বার্থের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নানা নিষেধাজ্ঞা মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান ও আধিপত্য প্রদর্শনে পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ব্যবহার করছে। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজন বহুমুখী বাণিজ্য ও বিকল্প ব্যবস্থা। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচক্ষণ কূটনীতি। যা বিশ্ববাজারে আমদানি, রপ্তানি ও বিনিয়োগ খাতে স্থির ব্যবস্থাপনা ও ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়ক হবে। বিশ্ব রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আইন বা কূটনীতির ক্ষেত্রে স্বীকৃত একটি উপায় স্যাংশন। যা বর্তমানে ক্ষমতার রাজনীতি ও আধিপত্যের অর্থনৈতিক কৌশলে অপপ্রয়োগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এই পরাশক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা ঢেউ। সামরিক প্রত্যক্ষ যুদ্ধের তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ একটি বিকল্প হল নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞার এই ইতিহাস কোনো নতুন ধারণা না হলেও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে কাঠামোগত নতুন নতুন দিক। যার ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রভাব শক্তি প্রয়োগের অনন্য উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐতিহাসিক নানা নিষেধাজ্ঞার ভোগ করা গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যস্ত ইতিহাস তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিলক্ষিত। ক্রমবর্ধমান হারে এই নীতির প্রয়োগ আন্তর্জাতিক বিশ্ব ব্যবস্থা ও ভূ রাজনীতিতে সৃষ্টি করেছে বিশ্ব উদ্বেগ। তাই পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তাদের নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলগত অবস্থানের উপর ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য। কেননা বৈশ্বিক ক্ষমতার খেলায় নীরব ভুক্তভোগী তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক খাত। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষমতার রাজনীতি বদলানোর ইতিহাস কিংবা আধিপত্য বিস্তারের কৌশল বদলানোর ইতিহাস। কিন্তু বদলায় না বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে তৈরি হওয়া নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতার ইতিহাস । তাই বিশ্বে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। কেননা সহমর্মিতা পূর্ণ আঞ্চলিক সুসম্পর্ক নিশ্চিত করবে বৈশ্বিক উন্নয়ন। মানবিক ও ন্যায় সঙ্গত কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং আস্থা ও শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা হবে বৈশ্বিক শান্তির স্থিতিশীলতা রক্ষার ভিত্তি।

 

সাবিহা তারান্নুম মিম

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

ইডেন মহিলা কলেজ

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!