সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সংগঠকদের ভাবনায়- “ফলাফল বিপর্যয়: শিক্ষাব্যবস্থার দূ্রবস্থা, নাকি শিক্ষার্থীদের নীতিগত সংকট?”

Author

মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৭ বার

এই বছর (২০২৬)  দেশের ১১ টি শিক্ষাবোর্ডে এসএসসি ও সমমান পরিক্ষার গড় ফলাফল ছিলো ৬২.২৫ শতাংশ। পাশের এই হারের পরিসংখ্যান পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। যার ফলে বারবার প্রশ্ন বিদ্ধ হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষা কাঠামো। ফলাফল বিপর্যয়- শিক্ষাব্যবস্থার দূ্রবস্থা,  নাকি শিক্ষার্থীদের নীতিগত সংকট? এই প্রশ্নই বর্তমানে ঘুরপাক খাচ্ছে ‌শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মানুষ থেকে শুরু করে জনসাধারণের আলোচনায়। আর এই প্রশ্নকে সামনে রেখে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠনের সংগঠকদের মতামত তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা।

সংকটের দায় দুই দিকেই:

‎বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের। মানসম্মত শিক্ষা, যুগোপযোগী পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক এবং বাস্তবমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিতভাবে গড়ে ওঠার পথে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

‎তবে ফলাফল বিপর্যয়ের দায় কেবল শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যথার্থ নয়। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। এর ফলে নিয়মিত পড়াশোনা, বই পড়া, অনুশীলন এবং কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝার চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতিও তাই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

‎একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের জন্য শুধু পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। নিয়মিত পড়াশোনা, সময়ের যথাযথ ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষের পাঠে মনোযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ফলাফলের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আরও মনোযোগী করে তুলতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর কেবল চাপ প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

‎শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদেরও সময়ের সঙ্গে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে, তেমনি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যমও হতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার সঙ্গে এর কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

‎ফলাফল বিপর্যয়কে তাই কোনো একক পক্ষের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের যেমন নিজেদের দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী ও কার্যকর করে তুলতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকের জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন সম্ভব। সংকটের সমাধানও তাই একদিকে নয়; এর দায় ও উত্তরণের পথ দুই দিকেই।

‎মোঃ জুনাইদ মোস্তফা

‎সভাপতি,

‎ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সাইন্স ক্লাব।

‎শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি  অবহেলা তাদের বিরূপ ফলাফলের জন্য দায়ী:

‎বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষার প্রতি মর্যাদা দেয় না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই শিক্ষাগ্রহণকে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট নেওয়া বলে মনে করে। ফলে তারা বছরের পর বছর এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উত্তীর্ণ হয় ঠিকই কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা তাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। তারা পড়ার সময় পড়ার বিষয়বস্তুকে মুখস্ত করে শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য। কিন্তু পঠিত পড়ার আসল অর্থ, উদ্দেশ্য এবং তা থেকে লব্ধ জ্ঞান তারা নেয় না।তাদের কাছে শিক্ষার মূল্য এখন কমে গেছে। আবার অপরজন শিক্ষার গুরুত্ব তাদেরকে বোঝাতে গেলে তারা মনে করে তাদেরকে অকারণে জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে। ঠিক একইভাবে তারা নিজেদের একাডেমিক পড়াকেই হেলা করে। এজন্য তাদের পড়ার প্রতি অবহেলাই তাদের ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য মূলত দায়ী।

‎আফিয়া আলম

‎কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক,

‎বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

‎বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার সংকট:

‎এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষার ফলাফলে সারাদেশে বিগত সময়ের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য বিপর্যয় লক্ষ করা গেছে। এ বছর ৩৭ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। আমার মনে হয়, এর পেছনে সাম্প্রতিক সংক্ষিপ্ত কারিকুলাম, পাঠদানের একঘেয়েমি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় আনন্দমুখী ও কার্যকর শিক্ষার ঘাটতি অন্যতম কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার প্রতি আগ্রহ ও সৃজনশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে চাপগ্রস্ত বা বিরক্ত না করে আনন্দের মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারিক ও জীবনমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিষয়বস্তু বোঝা ও প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

‎পাশাপাশি শিক্ষকদের সৃজনশীল ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করার সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীবান্ধব পাঠদান এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

ত্বকী ওয়াসীফ

‎সভাপতি,

‎ইবি রিসার্চ সোসাইটি।

শিক্ষার মূল কাঠামোগত ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা :

‎শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র ও ফলাফলের নিম্নগতিকে কেবল শিক্ষার্থীদের নীতিগত সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলের এই ফলাফল মূলত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের চেপে রাখা বাস্তব চিত্রটিকেই উন্মোচিত করেছে। অতীত সরকারগুলোর আমলে গণহারে পাস করানো, পরীক্ষার হলে শিথিলতা কিংবা অনৈতিক সুবিধার কারণে যে কৃত্রিম ‘ভালো ফল’ দেখানো হতো, তা ঢেকে রেখেছিল মূল ক্ষতকে। আজ সেই পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোই জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‎বিশেষ করে মফস্বল কিংবা গ্রামীণ পর্যায়ের বাস্তবচিত্র বেশ কঠিন। পরিবারের আর্থিক টানাটানিতে হাল ধরতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়। তার ওপর যুক্ত হয়েছে দক্ষ শিক্ষকের তীব্র সংকট। যেসব প্রতিষ্ঠানে গণিত, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, সেখানে বাধ্য হয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানো হচ্ছে। গ্রামীণ ও শহরের মধ্যে এই সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

‎একই সাথে, শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষে দায়সারা পাঠদান করে কোচিং বা প্রাইভেট বাণিজ্যে উৎসাহিত করার প্রবণতা বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে, টিকটক, গেম ও স্মার্টফোনের ক্ষতিকর আসক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের ফেরাতে প্রয়োজন শারীরিক খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পুনর্জাগরণ।

‎কৃত্রিম পাসের জোয়ার নয়, বরং শিক্ষার মূল কাঠামোগত ঘাটতিগুলো দূর করে পাঠদানকে শ্রেণীকক্ষমুখী করতে পারলেই কেবল শিক্ষার প্রকৃত মান ও সুফল ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

‎মো. রুহুল আমিন

‎কেন্দ্রীয় সভাপতি,

‎বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

শিক্ষার নিম্ন গুনগত মান:

‎ফলাফল বিপর্যয় শুধু মাত্র শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বিগত বছরগুলোতে পরিক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উদারনীতি অবলম্বনের কারনে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চাপা পড়েছিল, এবার কড়া মূল্যায়নে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে।

‎ঘনঘন কারিকুলাম পরিবর্তন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান না হওয়া ও কতৃপক্ষের অবহেলা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার অভাব, স্মার্টফোনে অতিরিক্ত আসক্তি, সহজ উপায়ে পাসের প্রবণতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ও ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য প্রবলভাবে দায়ী।

‎সুতরাং কৃত্রিমভাবে পাসের হার না বাড়িয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

‎আলী আহসান মাহমুদ জুবায়ের

সভাপতি,

‎হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটি,

‎ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।