বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

দুর্যোগে পরীক্ষা : দুর্ভোগের দায় কার

Author

আশা মনি , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ১২ বার

“শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎই দেশের ভবিষ্যৎ” বাক্যটি আমরা প্রায়ই শুনি।কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ যদি অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা কিংবা বন্যার সঙ্গে লড়াই করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পথেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যিই দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখছি?আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তবিক অর্থেই শিক্ষার্থীবান্ধব, নাকি এটি কেবল নীতিগত একটি প্রতিশ্রুতি?উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, বিষয় নির্বাচন এবং অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পেশাগত পথচলা।তাই সময়মতো পরীক্ষা সম্পন্ন করার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, পরীক্ষা তখনই অর্থবহ হয় যখন সব শিক্ষার্থী সমান ও নিরাপদ পরিবেশে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।গত ২ জুলাই শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা।এতে অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই,৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এর তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও পাহাড়ি ঢল, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।এই দুর্যোগে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ জানমাল রক্ষার চিন্তায় থাকলেও, উদ্বেগে ছিল লাখো পরীক্ষার্থী ও তাদের পরিবার।কীভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাবে, সময়মতো পরীক্ষা দিতে পারবে কি না এসব প্রশ্নই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা।পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য জেলার শিক্ষার্থীরা একই ধরনের সুযোগ পায়নি।ফলে সিদ্ধান্তটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।চট্টগ্রাম বিভাগের পাশাপাশি কুমিল্লা, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা, এমনকি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তবুও এসব এলাকার শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কেউ কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কেউ বৃষ্টিতে ভিজে, আবার কেউ নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছে।এমন দৃশ্য একটি আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত নয়।এছাড়াও উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন নিয়ে ক্ষোভ,চরম দূর্ভোগ পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের অসন্তোষমূলক অসংখ্য বক্তব্য।যা শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের গৃহীত সিদ্ধান্ত কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।শিক্ষা প্রশাসনের যুক্তি হতে পারে, জাতীয় পর্যায়ের একটি পরীক্ষা স্থগিত করা সহজ নয়।পরীক্ষার সময়সূচি, মূল্যায়ন, ফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত।কিন্তু প্রশাসনিক সুবিধা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের প্রধান দায়িত্ব।সময়সূচি বজায় রাখতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবন যেনো অনিরাপদ কিংবা হুমকির মুখে না পরে সে বিষয়টা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার মূখ্য বিষয় হওয়া উচিত।অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দূর্যোগের বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য আগাম বিকল্প পরিকল্পনা থাকা জরুরি।বৃষ্টিতে ভিজে বা চরম মানসিক চাপ নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জন্য স্বাভাবিক পারফরম্যান্স করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রিক অতিরিক্ত মানসিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।তাই শিক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য কেবল নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করা নয় বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান, নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।কারণ একটি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা সম্ভব,কিন্তু অবহেলার কারণে হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস, মানসিক আঘাত কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ক্ষতি সহজে পূরণ করা যায় না। দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শিক্ষার্থীকেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে এবং এটা শুধু কথায় নয়, বাস্তব নীতিতেও।

আশা মনি
ইংরেজি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।
ashamony494@gmail.com

লেখক: সাধারণ সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!