মাটিলডা ইফেক্ট: বিজ্ঞান যেভাবে হলো বয়েজ ক্লাব
ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দার্শনিক ইত্যাদি হিসেবে পুরুষদের নামই বেশি। নারীদের নাম কখনো একেবারেই শোনা যায় না, কখনোবা শত শত পুরুষ নামের ভিড়ে দুই-একটি নারী নাম উঁকিঝুঁকি দেয়। এই বিষয়টা আমাকে বরাবরই বেশ ভাবিয়েছে। নারীদের নাম এতো কম কেন? তারা কি পুরুষদের চাইতে কম যোগ্য, কম মেধাবী? কিন্তু আমার আশেপাশের পৃথিবীটা দেখে তো কখনো এমন মনে হয়নি। তাহলে ইতিহাসে কেন তাদের সংখ্যা এতো নগণ্য?
বড় হওয়ার পর পরিচয় হলো মাটিলডা ইফেক্ট নামক এক ঘটনার সাথে। এর সাথে সাথেই পরিষ্কার হয়ে গেলো আসল ব্যাপার।
মাটিলডা ইফেক্ট কী? সহজ কথায় এটি হলো নারী বিজ্ঞানী, গবেষক, উদ্ভাবকদের কাজের কৃতিত্ব পুরুষদের দেয়া। অর্থাৎ গবেষণা করলো নারী, উদ্ভাবন করলো নারী, জটিল অঙ্কগুলো কষলো নারী, কিন্তু পৃথিবী জানলো এগুলো করেছে একজন বা একদল পুরুষ। এই ব্যাপারটি মাটিলডা জসলিন গেজ ১৮৭০ সালে “Women as Inventor” শীর্ষক একটি রচনায় প্রথম লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে মার্গারেট ডব্লিউ রসিটার এই ঘটনার নাম দেন মাটিলডা ইফেক্ট।
বিজ্ঞান ও গবেষণাক্ষেত্রে নারী অপেক্ষা পুরুষদের বেশি গুরুত্ব দেয়ার রীতি নতুন নয়। আমাদের আশেপাশে এর অগণিত উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। মাটিলডা ইফেক্টের শিকার কিছু অসাধারণ নারী হলেন Rosalind Franklin, Lise Meitner, Jocelyn Bell Burnell, Nettie Stevens, Alice Bell প্রমুখ (নামগুলো এখানে ইংরেজিতে লেখা হলো যাতে কৌতূহলী পাঠক সহজেই গুগল সার্চ করে তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন)। এমনকি আইনস্টাইনের থিওরির পেছনের জটিল অঙ্কগুলো কষেছিলেন Mileva Marić, কিন্তু তিনি তাঁর কাজের যথাযথ স্বীকৃতি পাননি।
এখানে মাত্র কয়েকজনের নাম বলা হলেও এই ইফেক্টের শিকার আরও অসংখ্য নারী। তাঁদের মধ্যে অনেকের নাম আমরা পরবর্তীতে জানতে পেরেছি, অনেকে এখনও অন্ধকারেই থেকে গেছেন। এই প্রতিটি নারীকে নিয়ে এক একটি পূর্ণাঙ্গ আর্টিকেল লেখা যাবে। অনলাইনে খুঁজলে এরকম অনেক তথ্যবহুল আর্টিকেল আগ্রহী পাঠক পেয়েও যাবেন।
মাটিলডা ইফেক্ট কেন ঘটে? সংক্ষেপে বললে, পিতৃতন্ত্রের কারণে। পিতৃতন্ত্র নারীকে যেকোনো উপায়ে দমিয়ে রাখতে চায়। এরই চেষ্টাস্বরূপ দীর্ঘদিন ধরে নারীর যোগ্যতা, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মিথ্যা বলে এসেছে যে নারীদের বিজ্ঞানচর্চার যোগ্যতা নেই, বুদ্ধি কম, মেধা কম, শক্তি কম ইত্যাদি। পাশাপাশি পুরুষদের প্রচার করা হয়েছে নারীদের চাইতে বেশি শক্তিশালী, বুদ্ধিমান, ও যোগ্য হিসেবে। দীর্ঘদিন নারীদের শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্র থেকে কার্যত জোর করে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি আধুনিক যুগেও দীর্ঘদিন নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি ছিলো না।
এরূপ বৈষম্যের ফলে একদিকে যেমন নারীরা বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ পাননি, অন্যদিকে যাঁরাও বা শত প্রতিকূলতার পাহাড় ঠেলে বিজ্ঞান চর্চা করেছেন তাঁরা পাননি যথাযথ কৃতিত্ব। তাঁদের গবেষণাকে পুরুষদের চাইতে কম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তাঁদের সাথে কোনো পুরুষ সহকর্মী থাকলে ধরে নেয়া হয়েছে যে সে-ই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে৷ নারীরাও যে বিজ্ঞানী, গবেষক, উদ্ভাবক হতে পারে, নেতৃত্ব দিতে পারে—তা স্বীকার করতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কষ্ট হয়েছে, কিন্তু পুরুষরা যে এগুলো করতে পারে তা মানতে কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চোখে সেটাই স্বাভাবিক। তাই কোনো পুরুষ যখন নারী গবেষকের কাজের কৃতিত্ব দাবী করেছে, তখন সমাজ তা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছে।
সমাজের এহেন বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে এমনও হয়েছে যে অনেক নারীকে পুরুষ সেজে শিক্ষা নিতে বা কাজ করতে হয়েছে, পুরুষ নামে নিজের গবেষণা প্রকাশ করতে হয়েছে। ফলে ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়েছে একের পর এক পুরুষ নাম, বিপরীতে হারিয়ে গেছেন নারীরা।
এখন আমরা অতীতের তুলনায় অনেক এগিয়েছি। বর্তমানে নারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন, বিজ্ঞানচর্চা করতে পারেন। অনেক নারী বিজ্ঞানীর নামও এখন আমরা জানি। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাটিলডা ইফেক্ট এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। আজও নারীদের গবেষণাকে পুরুষদের চাইতে কম গুরুত্ব দেয়া, তাঁদের রিসার্চ সাইট করতে অনীহা দেখানোর প্রবণতা আছে। কারণ অনেক মানুষ এখনও নারীরা কম যোগ্য, পুরুষরা বেশি যোগ্য—এই ধরণের ভুল ধারণা পোষণ করে। এমনকি কোনো ফিল্ডে নারীদের সংখ্যা বেশি হলে সেই ফিল্ডকে অনেক সময় কম গুরুত্বপূর্ণ ধরে নেয়া হয় (রিভার্স মাটিলডা ইফেক্ট)।
মাটিলডা ইফেক্ট শুধু নারীদের প্রতি অবিচার নয়, পুরো মানবজাতির অগ্রগতির জন্যই বাধা। চিন্তা করে দেখুন তো, পৃথিবী আজ কতো দূর এগোতে পারতো যদি লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষ জ্ঞানচর্চার সুযোগ পেতো? আজও আমরা যেসব আবিষ্কারের মুখ দেখিনি, যেসব রোগ নিরাময় করতে পারিনি, জগতের যেসব রহস্য জানিনি, পর্যাপ্ত সুযোগ এবং স্বাধীনতা পেলে হয়তো অনেক নারী সেগুলো সমাধান করে ফেলতে পারতেন। হয়তো অনেকে করেছিলেনও কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজ শুধু তার ইগো রক্ষার্থে তা অস্বীকার ও গোপন করে মানবজাতির ক্ষতি করেছে।
আসলে যেকোনো ধরণের বৈষম্যই মানবসমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে৷ যেই মানুষটিকে ক্রীতদাস বানিয়ে রাখা হয়েছিলো, তার হয়তো মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের মতো মেধা ছিলো। যেই নারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেয়া হয়নি, তিনি হয়তো পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা পেলে কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি নির্মূল করতে পারতেন। রাজায় রাজায় যুদ্ধে যে শিশুর মৃত্যু হয়েছে, সে হয়তো বড় হতে পারলে একজন অসাধারণ দার্শনিক হতো। বৈষম্য কখনো সমাজকে ভালো কিছু দেয় না। এটি শুধু বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর অন্যায় আধিপত্য জিইয়ে রাখে।
মাটিলডা ইফেক্ট অনেক সম্ভাবনাময় নারীকে তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা এবং ক্রেডিট থেকে বঞ্চিত করে জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসকে পুরুষময় বানিয়েছে। পাশাপাশি নারীদের শক্তি কম, বুদ্ধি কম ইত্যাদি নানা নারীবিদ্বেষী ভুল ধারণাকে সমাজে পাকাপোক্ত করেছে। কিন্তু জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে কোনো এক বিশেষ লিঙ্গ, বর্ণ, বা শ্রেণীর মানুষের একার নয়। সকল শ্রেণীর, লিঙ্গের, বর্ণের মানুষেরই এতে অবদান আছে।
যেকোনো বৈষম্য টিকে থাকে মিথ্যার উপর ভর দিয়ে। মাটিলডা ইফেক্টও এর ব্যতিক্রম নয়। কাজেই এখন যতো বেশি আমরা সত্যটা জানবো, ততোই এর ভিত্তি ভেঙ্গে পড়বে। এজন্যই যারা সমাজে বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে চায়, তারা মানুষকে সত্য জানতে বাধা দেয়। একবিংশ শতাব্দীর এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তাই আমাদের উচিত সেইসব নারীদের সম্পর্কে জানা যাঁদের সাথে ইতিহাস অন্যায় করেছে। কারণ ইতিহাস যারা জানে না, তারাই বারবার এর পুনরাবৃত্তি করে।