টাঙ্গাইলে একদিন
বছরান্তে বরাবরই ঢাকার বাইরে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি শহরে যান্ত্রিকতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরে নতুনভাবে পড়াশোনার উদ্যম লাভের তাগিদে আরবি বিভাগ থেকে একটি ট্যুরের আয়োজন করা হয়। এবই ধারাবাহিকতায় এবার ট্যুরের স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল ঢাকার অদূরে অবস্থিত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনন্যা ধারক ও বাহক টাঙ্গাইল জেলায়। আমরা গিয়েছিলাম মহেড়া জমিদার বাড়ি ও পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, ২০১ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ ও ধনবাড়ী নবাব বাড়িতে।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। আমি তখন পড়ি ২য় বর্ষের ৪র্থ সেমিস্টারে। সেদিন ফজরের আগেই ক্যাম্পাসে পৌঁছালাম। কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আযানের সুর। মসজিদের অজুখানায় অজু সেরে জামায়াতের সাথে নামাজ আদায় করে নিলাম। এরপর পুরোপুরি ফ্রেশ হয়ে ভোরের অন্ধকারের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম বাসের খোঁজ নিতে। এই ট্যুরে মোট ৬টি বাস ভাড়া করা হয়েছিল। আগের রাতেই বাসগুলো আনা হয়েছিল। সকল প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল আগেভাগেই। বাসগুলো কিছুক্ষণ পরই সামনে চলে আসে। সবাই একে একে আসার পর সমস্ত জিনিসপাতি বাসগুলোতে তুলে দেওয়া হলো। প্রত্যেক বাসে একজন-দুজন করে শিক্ষককে পাঠানো হয়। আমাদের সাথে ছিলেন বিভাগের চেয়ারম্যান স্যার ও জহির স্যার। বাসে উঠার পর আমাদেরকে একটি করে টোকেন ও জার্সি দেওয়া হলো। সকাল সাতটায় বাসগুলো চলতে শুরু করল। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মির্জাপুরের মহেড়া জমিদার বাড়ি ও পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার।
বাসগুলো ক্যাম্পাস থেকে ছেড়ে যেতে ২০ মিনিট দেরি করলেও ড্রাইভারদের তৎপরতায় ঢাকা ছাড়তে দেরি হয়নি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠার পর আমাদেরকে সকালের নাস্তা হিসেবে ভুনা খিচুড়ি ও সেদ্ধ ডিম পরিবেশন করা হয়। অনেকে আগেভাগেই খাওয়া শুরু করেছিল। আমিসহ পেছনে বসা কয়েকজন পরে খেয়েছিলাম। সারা পথে বড়ো বক্সে কোনো গানবাজনা ছিল না; বরং একজন বন্ধুর একটি সাউন্ড বক্স ব্যবহার করে অনেকগুলো হিন্দি গান বাজানো হয়েছিল। গানের সাথে সাথে নাচ ও কোরাস গাওয়া হচ্ছিল। জহির স্যার খুবই মজার মানুষ। তিনি একজন কবিও। সেদিন স্যারের স্বরচিত কবিতা শুনে আমরা খুব মজা পাই। স্যারকে আমরা ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। গাজীপুরের চন্দ্রা মোড় ছাড়িয়ে আসার পর আমাদের গাড়ি ও পেছনের গাড়ির মধ্যে কিছুটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, যদিও সারা রাস্তায় চেয়ারম্যান স্যারের সুবাদে আমরাই আগে আগে ছিলাম। আমাদের ড্রাইভার অত্যন্ত চৌকস ছিলেন। তিনি দক্ষতার সাথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এভাবে সারা রাস্তায় আনন্দ করতে করতে একসময় সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে এসেছিল। এজন্য কখন যে মহেড়া জমিদার বাড়িতে চলে এসেছিলাম, তা ঠাওর করতে পারিনি, তাই নামফলকটার ছবিও তুলতে পারিনি।
গাড়িগুলো সকাল দশটায় জমিদারবাড়ির প্রধান ফটকের সামনে থামলে আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। আমাদের পরপরই অন্য জায়গা থেকে দর্শনার্থীদের আরও ৭টি গাড়ি এখানে চলে এলো। এখানে আমরা ২ ঘন্টাব্যাপী অবস্থানকালে জমিদারবাড়ির নানা অংশ ঘুরে ফিরে দেখলাম। নানা জায়গায় বসে সেলফি তুলেছিলাম। স্যারদের সাথে গ্রুপ ফটো তুলেছিলাম। কৃত্রিম ঝরনার পানিতে হাত ধোয়া, অ্যাকুরিয়ামের ছবি তোলা, ঘাসের ওপর বসা, জমিদারবাড়ির পিকনিক স্পটের চেয়ার-টেবিলের সাথে সময় কাটানো, স্যারদের সাথে খাওয়াদাওয়া ও গ্রুপ ফটো তোলা সবকিছুই মধুর স্মৃতি হয়ে আছে। আমার কাছে এখনও এ মুহূর্তগুলোর বেশকিছু ছবি আছে।
যাহোক, এখানে আগেই বলা হয়েছিল যে, বেলা ১২ টা পর্যন্ত এখানে দর্শনার্থীরা আসতে পারবেন। তাই আমরা এখান থেকে বারোটার কিছু আগেই বেরিয়ে পড়ি। পাছে না আবার কেউ পেছনে পড়ে যায় বা কারও জিনিসপত্র পেছনে পড়ে যায়, সেজন্য চেয়ারম্যান স্যার খোঁজ লাগানোর জোরালো তাগিদ দেন। বাসগুলো আসার সাথে সাথেই আমরা সবকিছু চেক করে উঠে পড়ি।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ২০১ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। এখান থেকে দুই ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে গোপালপুর উপজেলা সদর থেকে একটু ভেতরের দিকে মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির একটু আগে বাসগুলো থামলে সেখান থেকে নেমে পায়ে হেঁটে মসজিদে চলে এলাম। নান্দনিক স্থাপত্যকর্ম ও সুন্দর সুন্দর পাথরের টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে মসজিদটিতে। অজুখানা থেকে অজু সেরে যুহরের নামাজ আদায় করতে করতে দুপুর আড়াইটা বেজে যায়। সেখানেও বেশকিছু ছবি তোলা হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে বাসে উঠে বসলাম। মসজিদের পাশের পার্কিং-এর জায়গায় আমাদের বাসটি রাখা হয়েছিল। এখানে আমাদের একজন বাস ড্রাইভারের কারণে এখানে কিছুটা দেরি হয়ে যায়।
দুপুর তিনটায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের ৩য় গন্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি, ধনবাড়ী নবাব বাড়ির উদ্দেশে। সাড়ে তিনটা নাগাদ এখানে পৌঁছুই। এখানে এসেই হাতমুখ ধুয়ে খাবারের জন্য আগে থেকে টানিয়ে রাখা প্যান্ডেলের নিচে বসে পড়লাম। আগেই এখানে সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। খাওয়াদাওয়া শেষে আমরা চার বন্ধু মিলে নবাব বাড়ির দিঘির শানবাঁধানো পাড়ে বসে কথাবার্তা বলছিলাম। আসরের আযান হলে নবাব বাড়ির পাশের ৭০০ বছরের পুরোনো মসজিদে নামাজ আদায় ও নবাবের কবর যিয়ারত করে নিলাম। এরপর বিভিন্ন ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয় এবং বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। সবশেষে সন্ধ্যা সাতটায় আমরা বাসে উঠি।
এবারে ড্রাইভাররা শুরু থেকে একটু দ্রুত বাস চালাচ্ছিলেন, পাছে আবার ঢাকায় ঢোকার পথে যানজটে পড়তে হয়। পীরগাছা রাবার বাগান দেখার ইচ্ছে থাকলেও সময়স্বল্পতার কারণে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাসে পরিবেশন করা হয়। বনরুটি, চমচম মিষ্টি ও টিশার্ট। রাত নয়টা নাগাদ গাজীপুর চৌরাস্তা এসে যানজটে আটকা পড়ে যাই। স্টেশন রোডে পৌঁছাতে আরও দুই ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এখানে এসে আমি বাস থেকে নেমে পড়লাম। সবশেষে সেখান থেকে অটোযোগে রা ১১.৩০-এ বাসায় পৌঁছুলাম। এভাবে শেষ হলো আমার টাঙ্গাইল ভ্রমণ।
[শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]
