একবিংশ শতাব্দীর প্রুফ্রক
একবিংশ শতাব্দীর প্রুফ্রক
The Love Song of J. Alfred Prufrock টি. এস. ইলিয়ট রচিত একটি জনপ্রিয় কবিতা। কবিতায় কবি আধুনিক সমাজকে চিত্রিত করেছেন বিভিন্ন চিত্রকল্প ব্যবহার করে এবং দেখিয়েছেন মানুষের আশেপাশের পরিবেশ কীভাবে তাদের প্রভাবিত করে। এই কবিতায় প্রুফ্রক চরিত্রকে ব্যবহার করে কবি দেখিয়েছেন, সমাজ কীভাবে মানুষের আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, যা বর্তমান যুবসমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রুফ্রক ভয় পায় তার নিজের সিদ্ধান্ত সবাইকে বলতে; সে ভাবে মানুষ তাকে বিচার করবে। কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক সমাজে বাস করেও প্রুফ্রক নিজের মধ্যে একাকিত্ব অনুভব করে এবং সমাজের মানুষের আচার-আচরণ কীভাবে তাকে তুচ্ছ অনুভব করায়।
ঠিক তেমনি, আমাদের সমাজের যুবকেরা হতাশায় নিমজ্জিত। তারা তাদের ভাবনা সমাজের কাছে উপস্থাপন করার আগে মনে করে, সমাজ তাদের ভুল বুঝবে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষের নিখুঁত জীবনযাপন তাদের তুচ্ছ অনুভব করায়। তারা নিজের জীবনের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের জীবনের তুলনা করে। সমাজের ভয়ে তারা অনেক সময় মুখ বুজে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের মধ্যে একাকিত্ব অনুভব করে। ভুল করার ভয়ে তারা নতুন কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে না, এমনকি নিজে কী চায় সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে পায় না। এসকল ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ঠিকই আছে; তবে সমাজ কোনো এক পর্যায়ে এই সকল দ্বিধা আরও তীব্র করে তোলে।
মানুষের আচার-আচরণ অনেকাংশেই সমাজ দ্বারা প্রভাবিত। সমাজে মানুষ নিজের ভুলের থেকে অন্যের ভুল ধরায় বেশি ব্যস্ত। ফলে যুবকেরা যখন নিজে কিছু চেষ্টা করে এবং ভুল করে, তারা নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অথচ যে সমাজের কাজ ছিল তাদের উৎসাহিত করা, তারা তাদের ভুল ধরে এবং মনোবল নষ্ট করে। ভুল ধরা খারাপ কিছু নয়; বরং ভুল ধরে তাদের সব পরিশ্রমকে তুচ্ছ এবং তাদের অযোগ্য ঘোষণা করাই একটি অপরাধ।
একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়, তখন সমাজের নানান কটু কথার শিকার তাকে হতে হয়। এর ফলে ক্রমেই তারা নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারায় এবং ভাবে, পৃথিবীতে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। এই বিচারপ্রবণ সমাজ থেকে তারা বহুদূর চলে যেতে চায়। যেমন প্রুফ্রক নিজেকে সমুদ্রের জগতে কল্পনা করেছিল, যেখানে সে বাস্তব সমাজের বিচার ও প্রত্যাশা থেকে দূরে থাকতে পারে। নিজের জীবনের নায়ক হতে গিয়ে তারা সমাজের মানুষের চোখে গ্রহণযোগ্য একটি চরিত্র হতে চায়। ফলে বাস্তব জগৎ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন অনুভব করে।
ক্রমাগত তুলনা, প্রত্যাশা ও প্রতিযোগিতার ফলে সমাজে যেন প্রুফ্রক-সুলভ আত্মসংশয়ের বিস্তার না ঘটে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। কোনো ভুলের জন্য একটি মানুষের সব পরিশ্রমকে মূল্যহীন করা যাবে না; বরং একে অপরের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তবেই যুবকেরা নিজেদের বারবার প্রশ্ন করবে না-
“Do I dare
Disturb the universe?”
তারা নিজেদের ভুল, ভয়, অসম্পূর্ণতা নিয়েও বলবে-
“Yes, I dare.”
