বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বাবা-মা থাকা আর বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়া এক কথা নয়!

Author

তৌফিক সুলতান , ঢাকা মেডিকেল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ১৯ বার

বাবা-মা থাকা আর বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়া এক কথা নয়!

জীবনে আপনি নিশ্চয়ই বহুবার শুনেছেন— “সন্তানের মাথার ওপর বাবা-মায়ের ছায়া থাকাটাই সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।” কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন, সেই সব শিশুর কথা, যারা ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাতে রাত কাটায়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেঁচে থাকে, কিংবা মানুষের অবহেলা আর নির্মমতার মধ্যে শৈশব পার করে দেয়?

আপনার কি মনে হয়, তাদের সবার বাবা-মা নেই?

বাস্তবতা হলো, খোঁজ নিলে হয়তো এমন অনেক শিশুর সন্ধান পাওয়া যাবে, যাদের বাবা-মা দুজনেই বেঁচে আছেন। কেউ হয়তো আলাদা আলাদা সংসারে, কেউ হয়তো সচ্ছলতার মধ্যে বিশাল অট্টালিকায় জীবন কাটাচ্ছেন। অথচ তাঁদেরই কোনো সন্তান রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে, মানুষের করুণা নিয়ে বেঁচে আছে, কিংবা বুকভরা অভিমান নিয়ে শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু হারিয়ে ফেলছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—বাবা-মা বেঁচে থাকলেই কি একটি সন্তান সত্যিকার অর্থে বাবা-মায়ের আশ্রয়ে থাকে? নাকি বাবা-মা থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য?

আমাদের সমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, অহংকার, অবিশ্বাস কিংবা সম্পর্কের তিক্ততার পরিণতি বহন করতে হয় নিরপরাধ সন্তানকে। যে সন্তান কোনো ভুল করেনি, যে সন্তান তাদেরই রক্তের বন্ধনে পৃথিবীতে এসেছে, সেই সন্তানই একসময় বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলে।

বাবা-মায়ের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে—এটি জীবনের একটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভাঙনের সঙ্গে সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধও কেন ভেঙে যাবে? দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে, কিন্তু সন্তানের প্রতি তাঁদের দায়িত্বের কি অবসান ঘটে?

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, কখনো কখনো বাবা-মা নিজেদের নতুন জীবন গুছিয়ে নেন। নতুন সঙ্গী, নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই তাঁরা আবার জীবনের আনন্দ খুঁজে পান। নতুন সংসারে হয়তো নতুন সন্তান আসে; সেই সন্তানকে ঘিরে তৈরি হয় আদর, স্নেহ, আনন্দ আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

কিন্তু তখন প্রশ্ন জাগে—যে সন্তানটি আগেই পৃথিবীতে এসেছিল, তার অপরাধটা কী ছিল?

কেন একজন সন্তান নতুন সংসারে জন্ম নেওয়ার কারণে ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপত্তা পাবে, অথচ আগের সংসারের সন্তানটি একই বাবা-মায়ের সন্তান হয়েও অবহেলা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হবে? কেন একটি শিশুকে এমন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, যেখানে তার নিজের বাবা-মা অন্য কারও সঙ্গে সুখের সংসার গড়ে তুললেও তার নিজের জীবনে বাবা-মায়ের সান্নিধ্যটুকুই অনুপস্থিত?

সন্তান কোনো ব্যর্থ সম্পর্কের শাস্তি নয়। সে বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের দায় বহন করার জন্য পৃথিবীতে আসেনি।

একটি শিশুর কাছে বাবা-মা শুধু দুটি পরিচয় নয়; তাঁরা নিরাপত্তার আশ্রয়, ভালোবাসার প্রথম ঠিকানা এবং পৃথিবীকে চিনতে শেখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবলম্বন। সেই আশ্রয় যখন অবহেলায় ভেঙে পড়ে, তখন শিশুটি শুধু বাবা-মায়ের সান্নিধ্য হারায় না—অনেক সময় হারিয়ে ফেলে নিজের প্রতি বিশ্বাস, নিরাপদ বোধ করার ক্ষমতা এবং মানুষের ভালোবাসার ওপর আস্থা।

অথচ সমাজ প্রায়ই এসব গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে চায় না। আমরা শিশুটির অসহায়ত্ব দেখি, কিন্তু তার পেছনের ইতিহাস জানতে চাই না। তার ছেঁড়া পোশাক দেখি, কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের হিসাব রাখি না। ফুটপাতে ঘুমানো শিশুটিকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, হয়তো কিছু টাকা দিয়ে চলে যাই; কিন্তু কখনো প্রশ্ন করি না—কীভাবে সে এখানে এসে পৌঁছাল? তার কি কোনো পরিবার নেই? থাকলে, সেই পরিবারের দায়িত্ব কোথায়?

আমাদের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত সুখ, নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকার কিংবা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তগুলোর ফলে একটি অসহায় শিশুর জীবনে কী ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ শিশুটিরও অধিকার আছে নিরাপদ আশ্রয়, যত্ন, শিক্ষা, মর্যাদা এবং ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠার।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শুধু বাবা-মায়ের নয়; প্রশ্নটি আমাদের সামাজিক বিবেকেরও। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে সম্পর্কের ভাঙন ঘটলেও সন্তানের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে? যেখানে বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের আড়ালে কোনো শিশুর মৌলিক প্রয়োজন হারিয়ে যায় না? যেখানে অসহায় শিশুটিকে করুণার চোখে দেখার পাশাপাশি তার প্রতি অন্যায়ের কারণও খুঁজে দেখা হয়?

কারণ, একটি শিশুর বাবা-মা থাকা আর একটি শিশুর জীবনে বাবা-মায়ের উপস্থিতি থাকা এক বিষয় নয়। পরিচয় জন্ম দিতে পারে, কিন্তু দায়িত্বই একটি শিশুকে প্রকৃত আশ্রয় দেয়।

সব বাবা-মা এমন নন, সব বিচ্ছিন্ন পরিবারেও সন্তান অবহেলিত হয় না। অনেক বাবা-মা আলাদা হয়েও সন্তানের জন্য দায়িত্বশীল থাকেন। কিন্তু যেখানে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতা কিংবা নতুন জীবনের ব্যস্ততা সন্তানের প্রতি দায়িত্বকে আড়াল করে দেয়, সেখানে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—কারণ শিশুটির কোনো দোষ নেই।

একটি শিশুর শৈশব একবারই আসে। তার হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তা, অবহেলায় কেটে যাওয়া দিন কিংবা বাবা-মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জমে ওঠা অভিমান—সবকিছু অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না। তাই বিচ্ছেদ হোক কিংবা নতুন সংসার, কোনো সিদ্ধান্তের কেন্দ্র থেকে যেন সেই নিরপরাধ শিশুটিকে মুছে ফেলা না হয়।

শেষ প্রশ্ন—সমাজ কি সত্যিই এই শিশুদের নিয়ে ভাবে?

নাকি আমরা কেবল তাদের অসহায়ত্ব দেখে সাময়িকভাবে আবেগপ্রবণ হই, তারপর নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই?

যে শিশুটি নিজের বাবা-মা বেঁচে থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসা ও আশ্রয়ের অভাবে ফুটপাতে রাত কাটায়, তার দুর্ভাগ্য শুধু পারিবারিক নয়—এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।

একটি শিশুর জন্মের জন্য সে দায়ী নয়। বাবা-মায়ের সম্পর্কের ভাঙনের জন্যও সে দায়ী নয়। তাহলে সেই ভাঙনের সবচেয়ে বড় মূল্য তাকেই কেন দিতে হবে?

শিশুরা কোনো সম্পর্কের প্রতিশোধের মাধ্যম নয়, কোনো ব্যর্থ দাম্পত্যের বোঝা নয়, কোনো নতুন সংসারের অনাকাঙ্ক্ষিত অতীতও নয়। তারা মানুষ—তাদেরও অধিকার আছে ভালোবাসা পাওয়ার, নিরাপদে বেড়ে ওঠার এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার।

মনে রাখবেন, বাবা-মায়ের কাছে একটি সন্তান হয়তো জীবনের একটি অধ্যায়; কিন্তু সেই সন্তানের কাছে বাবা-মাই হতে পারেন তার পুরো পৃথিবী। সেই পৃথিবী ভেঙে দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবুন—যে শিশুটি কোনো অপরাধ করেনি, তার শৈশবের দায় নেবে কে?

— তৌফিক সুলতান
আল তৌফিকী পরিবার (তকী)

লেখক: প্রতিষ্ঠা কালীন দপ্তর সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।