বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৭৮ বার

বাংলাদেশের সংবিধান সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘের Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women (CEDAW) সনদে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীর অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) কনভেনশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের অঙ্গীকারের পুনরুচ্চারণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অঙ্গীকারগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তবেও তা প্রতিফলিত হয়েছে?

 

সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশ নারী দলের ক্রিকেটার জাহানারা আলম অভিযোগ তুলেছেন ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার একটি ইউটিউব চ্যানেলকে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এই সাক্ষাৎকারের পর থেকেই মিডিয়া পড়ায় হইচই শুরু হয়ে যায়। সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সহ সকলে এই বিষয়ে সুস্থ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো এই যৌন হয়রানি কি শুধু ক্রিকেট অঙ্গনে? নাকি প্রতিটি পদে পদে নারী এই হয়রানি শিকার হচ্ছেন। উত্তর হচ্ছে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে ছোট-বড় সব জায়গায় একই গল্প বারবার ফিরে আসে, শুধু চরিত্র আর প্রেক্ষাপট বদলায়। জাহানারা হয়তো সাহসী—কিন্তু সব নারী তাঁর মতো সাহস দেখাতে পারেন না। কারণ এই সমাজে এখনো সত্য বলার মূল্য দিতে হয় সম্মান, চাকরি, এমনকি জীবনের নিরাপত্তা দিয়ে। অনেকেই তাই চুপ থাকেন। নীরবতা অনেক সময় বেঁচে থাকার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

 

অধিকাংশ নারী শ্রমিক যৌন হয়রানির বিষয়টা বোঝেনই না। অনেকে মনে করেন, ধর্ষণই হচ্ছে যৌন হায়রানি। কিন্তু কর্মস্থলে একজন নারীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলা হচ্ছে, কীভাবে তাকানো হচ্ছে, সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী শারীরিক ও মানসিকভাবেও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকে সেটা বুঝতে পারছেন না। অনেক সময় অনেকে তাঁদের মুঠোফোনে অশালীন খুদে বার্তা পাঠাচ্ছে, গায়ে হাত দিয়ে কথা বলছে, এটাকে অনেকে যৌন হয়রানি মনে করছেন না।

আমাদের মনে রাখতে হবে একজন নারীর প্রতি কটূ দৃষ্টি, অশালীন রসিকতা, অযাচিত বার্তা, গায়ে হাত দিয়ে কথা বলা—সবই যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত। একজন নারী প্রতিদিন কর্মস্থলে এমন ‘ছোট ছোট’ অসংখ্য অপমানের মধ্যে দিয়ে যান, যা তাঁর আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়।

 

একসময় গার্মেন্টস সেক্টর ছিল নারীর যৌন হয়রানির প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে নারী বান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি করার ফলে সেখানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এখন নারীরা কাজ করছেন ব্যাংক, এনজিও, আদালত, গণমাধ্যম, সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা। এই বহুমাত্রিক কর্মক্ষেত্রে নারী নিরাপত্তা এখন আর কোনো sectoral বিষয় নয়—এটি মানবাধিকার ইস্যু। কোনো নারী তাঁর কর্মস্থলে নিরাপদ বোধ না করলে, তাঁর কর্মদক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মানে শুধু নারীকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি কার্যকর, ন্যায়নিষ্ঠ ও টেকসই সমাজ গড়া।

 

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, এমনকি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইনও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনগুলো অনেক সময়ই থাকে প্রতীকী অস্তিত্বে। গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন হয়রানির মামলার সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, আমাদের আইনব্যবস্থা এখনো নারীর পক্ষে নয়, বরং ক্ষমতাবানদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। সাহস করে কয়জন নারী প্রতিবাদ করলেও তার বিচার প্রক্রিয়া এত জটিল এবং সময়প্রেক্ষ যে মামলার ফলাফল আপনি না দেখেই মৃত্যু বরন করতে হতে পারে।

 

নারী সুরক্ষার জন্য অনেকগুলো হেল্পলাইন আছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন ৩৩৩। পুলিশ প্রশাসনের হেল্পলাইন ৯৯৯। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১০৯। এত হেল্পলাইন থাকায় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারে না, সে কোন নম্বরে কল করবে। দুদক একটা হেল্পলাইন করেছে ১০৬। প্রথম মাসে এখানে কল এসেছে প্রায় দেড় লাখ। পরের মাসে দুই থেকে তিন হাজার। মানুষ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কোন নম্বরে তারা কল করবে। কোথায় কল দিলে কার্যকর সাহায্য পাবে। নারী যখন নির্যাতনের শিকার হন, তখন তাঁর মাথায় থাকে ভয়, বিভ্রান্তি ও হতাশা—তাঁর পক্ষে তখন সঠিক নম্বর মনে রাখা বা বেছে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই জরুরি হলো একক সমন্বিত হেল্পলাইন, যেখানে কল করলেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, এবং দ্রুত সহায়তা পাওয়া যাবে।

 

এই ধরনের হয়রানি বন্ধ করতে আমাদের যা করনীয়:

১. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করতে হবে—শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে।

২. কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি—যৌন হয়রানি কী, তার প্রতিটি দিক সম্পর্কে জানাতে হবে।

৩. অভিযোগ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও গোপনীয় করতে হবে, যেন নারীরা ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন।

৪. হেল্পলাইন সমন্বয় করে একক নম্বর চালু করতে হবে।

৫. বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে—দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীর দ্বিতীয় নির্যাতনে পরিণত হয়।

৬. রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা পরিচালনা করতে হবে যাতে ভুক্তভুগীর অর্থনৈতিক কোন জামেলা তৈরি না হয়।

 

 

নারীকে তাঁর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে হবে। তিনি যদি কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করতে পারেন, তাহলে বেশি কাজ করতে পারবেন। তাই কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। শুধু পোশাকশিল্প নয়, দেশের যেকোনো কর্মক্ষেত্রে নারীরা কাজ করুন না কেন, সব ক্ষেত্রে তাঁদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেন তাঁরা কোনোভাবেই যৌন হয়রানির শিকার না হন। দেশে আজ প্রায় সব ধরনের পেশায় নারীরা কাজ করছেন। তাঁদের যদি আমরা নিরাপত্তা দিতে না পারি, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। বাড়ি, কর্মস্থল, পরিবহন, রাস্তাঘাট-কোথাও নারী নিরাপদ নন। সর্বত্র নারীর প্রতি একধরনের হয়রানি, সহিংসতা, নির্যাতন চলছেই। যত দিন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে নারীর সম্মান না বাড়বে, তত দিন এ সহিংসতা চলতেই থাকবে। নারী সংসারে, সমাজে, রাষ্ট্রে সমানভাবে অবদান রাখছেন। তাই তাঁরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!