বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নূর হোসেন থেকে আবু সাইদ- স্বপ্নের বাংলাদেশ কতদূর।

Author

মোঃ হাসনাইন রিজেন , হাটহাজারী সরকারি কলেজ চট্টগ্রাম।

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৮৩ বার

শহীদ নূর হোসেন যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” একটি লেখা। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন স্বৈরাশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ১০ নভেম্বর শহীদ হোন নূর হোসেন। ১৯৮০- এর দশকে জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এই দখলদারের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্র সমাজ, রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর মিছিলে অংশগ্রহণ করেন এবং পুলিশের গুলিতে নিহত হন। নূর হোসেন নিহত হওয়ার পর থেকে সারাদেশে বিক্ষোভের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন। এর পরথেকে “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগানে পরিনত হয়।

 

যেই গনতন্ত্রের জন্য নূর হোসেন জীবন দিয়েছে তার মৃত্যুর প্রায় চার দশক পরে এসেও কি আমরা সেই গনতন্ত্র পেয়ছি? ভোটের মাধ্যমে শুধু ক্ষমতা বদলানোর নাম গনতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র মানে হলো—জনগণের মতামত ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। যেখানে স্বাধীনতা, সমতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার বিদ্যমান থাকে।

আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে —গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের কোন সরকার কি জনগণের সরকার হয়ে উঠেছে? স্বাধীনতার ৫৪ বছরে ও কেন আমরা এমন কোন সরকার পেলাম না যার মাধ্যমে আমরা সাধারণ জনগণের প্রতিছবি দেখতে পাবো।

 

নূর হোসেন ১৯৮৭ সালে তৎকালীন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের নায়ক। যিনি জীবন্ত পোস্টার হয়ে গণতন্ত্রকামী মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকে স্লোগানের অক্ষরে বুকে-পিঠে ধারণ করেছিলেন। আর এই যুগের আবু সাঈদ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী-স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। নূর হোসেনের আত্মদানের পর ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। আর আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। হাজারের বেশি ছাত্র-জনতার প্রাণহানি এবং অসংখ্য আহত মানুষের রক্তের ওপর দাড়িয়ে আমরা আবার গনতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি।

 

আজকের বাংলাদেশে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতি হওয়া উচিত, যেখানে ভিন্নমত সহিষ্ণুতা, আইনের শাসন, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবাধীন। বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। এবং তরুণদের রাজনৈতিক মত প্রকাশ সীমিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি শুধু গণতন্ত্রকেই নয়, নাগরিক সমাজকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

 

আজকের তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে আদর্শিক নেতৃত্বের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। সুশিক্ষা, মানবিকতা, এবং সচেতনতার মাধ্যমে তারা যেন ‘দল নয়, দেশ’—এই চেতনায় রাজনীতিকে এগিয়ে নেয় সেই শিক্ষা দিতে হবে। নূর হোসেন বা আবু সাইদ—তারা কেবল ব্যক্তি নন, বরং একটি প্রজন্মের প্রতীক। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে—তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো। স্বচ্ছ প্রার্থী বাছাই করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সহিংস রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো নৈতিক নেতৃত্বের অভাব। যখন রাজনীতি অর্থ, ক্ষমতা ও প্রতিহিংসার উপকরণে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র কেবল কাগজে- কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। গণতন্ত্র কেবল রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব এই সচেতনতা মানুষের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

 

নূর হোসেন গণতন্ত্রের জন্য প্রাথমিক অধিকার (ভোট) নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু আবু সাঈদদের লড়াই ছিল সেই গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে অর্থবহ করার, যা কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং ন্যায়, বৈষম্যহীনতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা দেওয়া। ​নূর হোসেনের রক্তের বিনিময়ে যে গণতন্ত্র এসেছিল তা দীর্ঘমেয়াদী সুফল দিতে পারেনি। ফলস্বরূপ, নতুন স্বৈরাচারের উত্থান হয়েছে। আবু সাঈদসহ অসংখ্য ছাত্র জনতার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জনগণকে আবারও প্রমাণ করেছে যে গণতন্ত্রের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, এটি শুধু ভোটের অধিকারের নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণমুক্ত সমাজের সংগ্রাম।

লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!