বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কেমন আছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০১১ পাঠ: ২৩৯ বার

শিক্ষা হল একটি জাতিকে উন্নত ও সভ্য জাতিতে পরিণত করার একমাত্র হাতিয়ার। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতি রয়েছে। তবে গতানুগতিক অধিকাংশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় একই রকম। দেশের শিক্ষার পর্যায় ভাগ করলে বলা যেতে পারে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত অধ্যয়ন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। এরপর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করে কলেজে। এরপরেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের দৌড় শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। আসন পর্যাপ্ত না হবার কারণে যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পায়না তারা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মান শ্রেণীতে অধ্যয়ন করে থাকেন। তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলো বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়ালেখা হওয়া উচিত আনন্দ ও উৎসাহময়। এখানে জ্ঞানের চর্চা হওয়া এবং নিত্য নতুন গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের সৃষ্টি হবে এটিই কাম্য। কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিরানন্দ একটা পরিবেশে কোন রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করে থাকে। যেসব ছেলেমেয়েরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে তারা একটা ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারে এবং তা অনেকক্ষেত্রেই হয় একটা চাকুরী লাভের উদ্দেশ্যে।

একসময় এই দেশের অল্প কিছু মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করত। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল হাতেগোনা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৪টি। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে ঠিক পাল্লা দিয়ে উচ্চশিক্ষার বাম্পার ফলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪১টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তিনগুন। নামে-বেনামে যেভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তাতে উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে।

এরপরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরেও যে ছাত্র-ছাত্রী বা অভিভাবকেরা যে স্বস্তিতে থাকেন তাও না। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, কথিত ভাল(!) বিষয় নামে যে ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তার উপর ভিত্তি করে অনেক শিক্ষার্থীকে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে বাবা মায়ের ইচ্ছায় ভর্তি হতে হয়। এরপরে আরেক ধরনের উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর কেউ দ্বিধায় ভুগে থাকেন যে এই বিষয়ে পড়ে আমার ভাল চাকুরী হবে কিনা? অথচ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভর্তি হবার পর এইরকম দীর্ঘশ্বাস বা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ার কথা ছিল না বরং প্রত্যাশা ছিল আগ্রহ, উৎসাহ নিয়ে গবেষণাধর্মী পড়ালেখা করে নিজ, দেশ ও জাতি গঠনের একজন দক্ষ কর্মী হওয়া।

শাস্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান সৃষ্টি, আহরণ ও বিতরণ কেন্দ্র। কিন্তু অতীব রাজনীতি চর্চার ফলে শিক্ষার মান যেভাবে গড়ে ওঠার কথা ছিল বা মৌলিক গবেষণা যেভাবে হবার কথা ছিল সেটির প্রত্যাশা পুরোপুরিভাবে অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

এবার বলতে চাই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কিছু কথা। আমার মনে আছে, অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার সম্ভবত পত্রিকায় লিখেছিলেন, আমার আনন্দ লাগে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া ছেলেটি বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর লোভনীয় চাকুরীতে যোগ দেবার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার আগ্রহ বেশি দেখায়। আমার মতে, স্যারও হয়ত এটা জানেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া সকল ছেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার গৌরব অর্জন করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন হয় অলিখিত আত্মীয়কোটা, লবিং কিংবা ক্ষমতাসীন দলের আশির্বাদ। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকার এইভাবেই দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহনের আঙ্গিনাকে এইভাবে সাজিয়ে থাকে। আমি নিজেই দেখেছি, একজন শিক্ষক তার বিভাগে অনার্সে ২৭ তম হয়েছিলেন। এরপর মাস্টার্সে কোন রকমে প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন। রাজনৈতিক আশির্বাদে বর্তমানে তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! এইরকম ব্যক্তি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে তখন তিনি পাঠদানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন লালদল বা নীলদল কিংবা সাদাদল নামের শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতা হতে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব ঘটছে। বলা যায় মেধাহীন ব্যক্তি দিয়ে মেধাবী গঠনের কাজ করানো হচ্ছে। রাজনৈতিক ছায়াতলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর উনারা ক্লাসে কিংবা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যেভাবে বক্তব্য দেন, তা শুনে মনে হয় যেন উনারা ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি। এমনকি বর্তমানে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরসহ বিভিন্ন শিক্ষকের নামে সরাসরি ভোট চাওয়ার খবরও পত্রিকার পাতায় শোভা পায়।

এইবার বলতে চাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির একসময় অনেক সুনাম ছিল। দেশের ক্রান্তিকালে কিংবা কোন সংকট তৈরী হলে অথবা ছাত্র-জনতার নায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা ছিল অতীব প্রশংসনীয়। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদের পতন আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা আজও সোনালী অক্ষরে লিখা আছে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি কেমন যেন একটু কলুষিত হয়ে তার অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। পোস্টার পোড়ানো, ব্যানার ছেঁড়া, প্রতিহিংসার রাজনীতি চর্চার ফলে এখন মেধাবী শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনে স্বেচ্ছায় আসতে চায় না। স্বেচ্ছায় বললাম কারণ, বর্তমানে রাজনীতি হয়ে পড়েছে সুযোগ নির্ভর। প্রচলন হয়েই গেছে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতি করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকা যাবে নচেৎ তার ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসে বিচরণ করাও নিরাপদ নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আসে মফস্বল থেকে। এক সাগর স্বপ্ন নিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় এসে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে তখনই ছাত্রনেতারা স্বেচ্ছায় তাদের ছায়া হয়ে আসে কেবলমাত্র নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য। এরপর হলে একটা থাকার জায়গা আর টিউশনি খুঁজে দিয়ে অনুগত কর্মী হিসেবে সেই ছাত্রসংগঠনের রাজনীতির সাথে যুক্ত করা যেন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে পড়েছে। এছাড়াও জেলাকল্যাণের নেতৃত্ব নির্বাচনে অতিমাত্রায় দলীয়করণ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছাত্ররাজনৈতিক দলের নেতাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ, আদর্শিক প্রতিপক্ষকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন, মারামারি, হানাহানি শিক্ষাঙ্গনে আতঙ্ক তৈরীর যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্পাসে অতিমাত্রায় রাজনীতি চর্চার ফলে একজন বাবা নিশ্চিত হতে পারেন না যে তার ছেলে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে আসতে পারবে। একজন মা সবসময় আতঙ্কিত থাকে যে, তার মেয়ে সম্ভ্রম নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা? এইজন্য কখনো কখনো শিক্ষাঙ্গণে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবীও উঠে।

গ্রন্থাগার হলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যা অহঙ্কারের স্থানও বটে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন বিসিএস, ব্যাংক জব বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অহঙ্কারের জায়গাগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। এইসব পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধারা যেমন, একজন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকেই ঠিক সেই ধারায় পড়ালেখা শুরু করছে। এখন গ্রন্থাগারগুলোতে শিক্ষার্থীরা নিয়ে যায় কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, জব সল্যুশন, বিভিন্ন চাকুরির পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক বই। আবার কখনও কখনও শিক্ষকেরাও এই পথে যাবার বিশেষ অনুপ্রেরণা(!) দিয়ে থাকেন। আমার ছোট ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ সেশনে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিন ক্লাসে এসেই একজন শিক্ষক বলেছেন, তোমরা জবকেন্দ্রিক পড়ালেখা করবা নয়মাস আর ডিপার্টমেন্টের পড়া পড়বা তিনমাস। একজন শিক্ষক যখন এই কথা বলেন, তখন কিভাবে সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা হবে আর কিভাবেই বা নতুন জ্ঞাণের সৃষ্টি হবে!

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো আবাসিক হলসমূহ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অধিক ছাত্রকে হলে স্থান দেবার জন্য একরুমে যেখানে দুইজন বা তিনজন থাকার কথা সেখানে থাকতে বাধ্য করা হয় আট থেকে দশ জনকে। এই হলরাজনীতির ফলে জিম্মি করা হয় হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। মিছিলে যোগ দেওয়া হয় তাদের বাধ্যতামূলক কাজ। বিরোধীমতের শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করানো যেন নিত্যদিনের কাজ। আবার হলের ডাইনিংয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের ফ্রী খাওয়ার প্রবণতার ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং বন্ধ থাকার খবরও পাওয়া যায় পত্রিকার পাতায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বলা হয় উচ্চশিক্ষা। গবেষণা ছাড়া উচ্চশিক্ষা কখনো পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা প্রত্যাশামত হচ্ছে না। শিক্ষকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোতে গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দ খুব কম। এর ফলে গতানুগতিক শিক্ষা দেওয়া হতেই আছে। বহু বছর আগে প্রণিত সিলেবাস দিয়েই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। তাছাড়া অর্থের পাশাপাশি মানসিক সঙ্কটও গবেষণার অন্যতম অন্তরায়। নতুন জ্ঞাণ সৃজন করার পরিবর্তে অর্থকেই পরমার্থ মনে করছেন অনেক শিক্ষক। এক বা একাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা, সান্ধ্যকালীন কোর্স প্রভৃতিতে মনোযোগী হয়ে শিক্ষাব্যাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয়ে যাবার ফলে গবেষণার আর তেমন সময় থাকে না। এর ফলে পূর্বে তৈরীকৃত কোন গবেষণাধর্মী নোট শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা আর বহু বছর আগে তৈরীকৃত স্লাইড প্রোজেক্টরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করাকেই অনেক শিক্ষক উচ্চশিক্ষা হিসেবে পরিগণিত করে নিচ্ছেন। এভাবে জ্ঞানহীন শিক্ষা গ্রহণ করে সার্টিফিকেট অর্জন করার ফলে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক যেন ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের রূপ নিয়েছে।
আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়াতে প্রেজেন্টেশন, বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট, টিউটোরিয়াল, ইনকোর্সসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হবার ফলে কোর্সের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমন সময় কমেছে অনেক গুণ। অল্প সময়ের মধ্যেই কোর্স শেষ করার তাগাদা থাকে বলে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের বিষয় সম্বন্ধে বিস্তর ধারণা দিতে পারেন না। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টির জ্ঞাণের গভীরতা নয়, বরং প্রাথমিক ধারণা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অব্যবস্থাপনার কথা, একজন শিক্ষার্থীর দাবী, চাহিদা কিংবা মনে কথা বলার সুযোগ বলার আবাসিক হলে বা ক্লাস রুমেও নেই। ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলে রয়েছে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের দাপট, আর শিক্ষকের হাতে রয়েছে ৩০ নাম্বার। ব্যক্তিগত আক্রোশে এ ক্ষমতা অপব্যবহারের নজির আছে ভুরিভুরি। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। কিন্তু যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সেই সরকারের ছাত্রসংগঠনের ও শিক্ষকনেতাদের প্রভাব, আধিপত্য এতোটাই থাকে যে প্রশাসনের অস্তিত্ব অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। ক্যাম্পাসে চলে অস্ত্রের মহড়া, মাদক, ছিনতাই, যৌন হয়রানির মত ঘটনা। অথচ অনেক সময় এইসব দেখার মতো কেউ থাকেনা। এমন অগণতান্ত্রিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মনন কাঠামো কিভাবে তৈরি করবে তা যথেষ্ট ভাবনার বিষয়। ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যেত যদি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পেত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কোন এক অদৃশ্য কারণে হচ্ছেনা। ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। কিন্তু আফসোস! প্রায় দুই যুগ থেকে আমাদের দেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বাতাস বয়তে দেখা যায়নি। সম্প্রতি হাইকোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে ছয় মাস সময় বেঁধে দিলেও তা কার্যকর নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হবার ফলে ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বের গুনাবলি বিকাশে বাধা হচ্ছে এবং তারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

পাবলিক বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু অসুস্থ ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চালু রয়ে গেছে। প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার পর সিনিয়র ব্যাচের কাছ থেকে কথিত র‌্যাগিং নামক জঘন্য পদ্ধতি যে চলে আসছে, পরবর্তী যখন সে তার জুনিয়র ব্যাচকে নাগালে পায় তখন তার মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা তৈরি হয়। র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করা, আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার উদাহরণও ভুরিভুরি আছে। অবিলম্বে এসবের প্রতিকার করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচরণকারীরা প্রত্যেকেই যেন একেকজন বিশ্বমানের নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে এইজন্য সরকারকে এখনই নজর দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাখাতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অবিলম্বে যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে বলতে হবে এই চোরাবালি পদ্ধতিতে শিক্ষাব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে তা দেশের জন্য একদিন মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

 

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদ।
এই লেখাটি ২৭ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে সোনার বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!