শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কর্জে হাসানা : ইসলামী অর্থনীতির এক যুগান্তকারী ব্যবস্থা

Author

আজহারুল ইসলাম পিয়াস , Islamic University, Kushtia

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৭৩ বার

মা নুষ সৃষ্টিগত ভাবেই সামাজিক জীব হওয়ার দরুন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক আদান-প্রদানের প্রয়োজন হয়, যার অন্যতম হলো লেনদেন। সে ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় সমাজে লক্ষ্য করা যায়, আর তা হলো সয়লাব ও সঙ্কট। একদিকে সুদভিত্তিক ঋণের সয়লাব, অন্য দিকে সুদবিহীন ঋণের সঙ্কট। এক দিকে সামান্য প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করা হয়, এমনকি বিনা প্রয়োজনে শখ-আল্লাদ পূরণ করতে অনেকে ঋণ করে। অন্য দিকে সত্যিকারার্থে যার প্রয়োজন সেখানে ঋণ তথা বিনা সুদে ঋণ বিরল। যা ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গঠনের বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর এই প্রতিবন্ধকতার মূলোৎপাটনে প্রয়োজন ইসলামী অর্থব্যবস্থার ‘কর্জে হাসানা’। এবার আমরা জানবো কর্জে হাসানা কী, কেন আর ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এর কী ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে? বি- ঈযনিল্লাহ।

আরবি অভিধায় কর্জ হলো ধার তথা ঋণ। আর ‘কর্জে হাসানা’ বলতে উত্তম ঋণ বুঝায়। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায়, সাওয়াবের উদ্দেশ্যে বিনা শর্তে কোনো ব্যক্তিকে কিছু ঋণ দেয়াকে কর্জে হাসানা বলা হয়। আল্লাহ তায়লা পবিত্র কুরআনুল কারিমে ঋণকে কর্জে হাসানা বলে নামকরণ করেছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে কর্জে হাসানা (উত্তম ঋণ) প্রদান করবে? ফলে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ, বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আর আল্লাহ তায়ালাই রিজিক সঙ্কুচিত করেন ও বৃদ্ধি করেন। তোমাদের তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।’ (সূরা বাকারা: ২৪৫) এ ছাড়া অন্য আয়াতেও কর্জে হাসানার কথা এসেছে। যেমন- এরশাদ হচ্ছে, ‘এমন কেউ কি আছে, যে আল্লাহকে ঋণ দিতে পারে? কর্জে হাসানা (উত্তম ঋণ), যাতে আল্লাহ তা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেন। আর সেদিন তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান।’ (সূরা হাদিদ: ১১)

আর হাদিসে নববীতেও এসেছে কর্জে হাসানার বিশেষ ফজিলতের কথা। হজরত আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করে তার দরজায় একটি লেখা দেখতে পেল যে সদকার নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হয় এবং ঋণদানের নেকি ১৮ গুণ বৃদ্ধি করা হয়।’ (সিলসিলা সহিহা ৩৪০৭) অন্য আরেক বর্ণনায় নিঃশর্ত ঋণ দেয়াকে সদকা বলে গণ্য করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঋণই সদকাস্বরূপ’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৩২৮৫)।

আরো বলেছেন, ‘যে মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে দুইবার কর্জ দেয়, সে ওই পরিমাণ সম্পদ একবার সদকা করে দেয়ার সওয়াব পায়।’ (ইবনে মাজাহ : ২৪৩০)

সাধারণত কোনো নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ তায়ালা কমপক্ষে দশগুণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কর্জে হাসানার সওয়াব এর চেয়েও বেশি দিয়ে থাকেন। হজরত আনাস ইবন মালিক রা: বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মিরাজের রাতে আমি জান্নাতের একটি দরজার ওপর লেখা দেখলাম, সদকায় ১০ গুণ সওয়াব এবং কর্জে (ঋণে) ১৮ গুণ। আমি বললাম, হে জিবরাঈল! কর্জ সদকার চেয়ে উত্তম কেন? তিনি বললেন, কারণ ভিক্ষুক তার কাছে (সম্পদ) থাকতেও চায়। আর কর্জদার প্রয়োজন ছাড়া কর্জ চায় না’ (ইবনে মাজাহ: ২৪৩১) ঋণ নেয়ার পর কিছু মানুষ পরিশোধের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে যায়। তাদের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার যেমন বৈধতা রয়েছে; তেমনি যারা অসচ্ছলতার দরুন ঋণ পরিশোধে সক্ষম হচ্ছে না তাদেরকে সময় দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

পবিত্র কালামুল্লাহ মাজিদে এরশাদ হচ্ছে, ‘এবং কোনো (দেনাদার) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ পর্যন্ত (তাকে) অবকাশ দেয়া উচিত। আর যদি সদকা করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটা অধিকতর শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সূরা বাকারা: ২৮০)

হাদিস নববীতে এসেছে, অসচ্ছল ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে যতদিন সময় দেবে সে ততদিন সদকার সওয়াব পেতে থাকবে। রাসূল সা: বলেন, ‘যে গরিবকে (তার ঋণ আদায়ে) সময় দেবে, সে প্রতিদিন সদকা দেয়ার মতো সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি তার মেয়াদ চলে যাওয়ার পরও তাকে সময় দেবে, সে প্রতিদিন সেই ঋণের সমপরিমাণ সদকা করার সওয়াব পাবে।’ (ইবনে মাজাহ: ২৪১৮)

বর্তমান যুগে সুদের মতো মরণব্যাধির দৌরাত্ম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে কর্জে হাসানা মুসলিম সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি সমাধান। এই সুন্নাহ পুনর্জীবিত হলে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবিকতা ও আর্থিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত, সামর্থ্য অনুযায়ী কর্জে হাসানা দেয়া, সুদ থেকে দূরে থাকা এবং সমাজে কর্জে হাসানার মতো ব্যবস্থা সচল করতে উৎসাহ দেয়া।

লেখক: সহযোগী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!