বর্ণবাদ একটি সামাজিক ব্যাধি

বর্তমানে বর্ণবাদ বলতে শুধুমাত্র শরীরের রঙের উপর ভিত্তি করে মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করা বুঝায় না। বরং কখনো গায়ের চামড়ার রং, কখনো পেশা কিংবা গোত্র এমনকি ধর্ম ইত্যাদি মাধ্যমে মানুষের মাঝে উঁচু-নিচুর ভেদাভেদের নাম বর্ণবাদ। এই চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করার মূল লক্ষ্যই ছিল কর্তৃত্ববাদ। মূলত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উপর শ্বেতাঙ্গ মানুষদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বর্ণবাদ প্রথার মাধ্যমে।
১৬৫২ সালে প্রথম শ্বেতাঙ্গদের আগমন ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকায়। দক্ষিণ আফ্রিকা মূলত ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের মাতৃভূমি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান ছিল খুব অস্বচ্ছল। যার ফলে শ্বেতাঙ্গদের আগমনের পর তারা কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এখান থেকেই মূলত কর্তৃত্ববাদের শুরু। ১৯৩০ সালে সর্বপ্রথম বর্ণবাদ শব্দটির উৎপত্তি হয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগানে এর ব্যবহার হতে দেখা যায়। ১৯৪৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি পত্রিকায় ‘আপার্টহাইট’ শব্দটির প্রচার করা হয়। আপার্টহাইট শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো, বিভাজন বা বিচ্ছিন্নতা। ১৯৪৮ সালে ন্যাশনালিস্ট পার্টি দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকার গঠণ করলে তারা আইন পাশের মাধ্যমে বর্ণবাদের বৈধতা দেয়।
১৯৪৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় উত্থান ঘটে এক বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। তিনি ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ১৯৪৪ সালে ইয়ুথ লিগ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সশস্ত্র সংগঠন উমখন্তো উই সিযওয়ের নেতা হিসাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যার ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে ও অন্তর্ঘাতসহ নানা অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তিনি একাধারে ২৭ বছর কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিলেন। তার এরূপ অসীম সাহস ও ত্যাগের ফলে ১৯৯১ সালে আইন করে বর্ণবাদ প্রথা কে বিলুপ্ত করা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা তার একটি বক্তব্যে বলেন, ‘আমি বর্ণবাদকে ঘৃণা করি কারণ এটা একটা বর্বর বিষয়, তা সে কালো বা সাদা যে কোন মানুষের কাছ থেকে আসুক না কেন।’
কিন্তু আসলেই কী বর্ণবাদ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে? আমাদের দেশে শহর কী গ্রাম সব জায়গায় বর্ণবৈষম্য লক্ষ করা যায়। বলা হয়, কালোই জগতের আলো। কিন্তু এর বাস্তবতা কতটুকু? একটি শিশু যখন কালো হয়ে জন্ম গ্রহণ করে তখন তার চারপাশের লোকেরা তাকে দেখে নাক সিটকায়। কিন্তু তার এই রঙের পেছনে শিশুটির দোষ কী আদৌ আছে? বিজ্ঞান বলে, দেহে মেলানিন তৈরি বেড়ে গেলে ত্বকের রং গাঢ় বা কালো হয়ে যায়। কিন্তু এরপরও শুধু শুধু শিশুটিকে অবহেলা করে ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় পারিবারিকভাবে শিক্ষার উন্মেষ না ঘটার ফলে শিশুর মস্তিস্কেও এরূপ প্রভাব পড়তে পারে। যার ফলে স্কুলে গিয়ে সে তার কোন কালো সহপাঠির সাথে বসতে চায় না। আর কালো শিশু হীনমন্যতায় ভুগে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
গ্রামাঞ্চলে বর্ণবাদ যেন এক মহামারী আকার ধারণ করেছে। মেয়েকে শিক্ষিত করার চেয়ে তার চেহারা ফর্সা করতে যেন কত তোড়জোড়। কারণ মেয়ে ফর্সা না হলে তার বিয়ে সহজে হবে না। আর যদি বিয়ে দিতে হয় তবে মোটা অঙ্কের যৌতুকের বিনিময়ে তাকে বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে। কথায় আছে, আগে দর্শনধারী তো পরে গুণবিচারী। এই কথা কি বর্ণবাদকে উস্কে দিচ্ছে না! অথচ আবার বলা হচ্ছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। এরূপ দ্বিচারী নীতি বন্ধ না হলে বর্ণবৈষম্য কখনোই দূর করা যাবে না। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মানুষ জাতি কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভিতরে সবার সমান রাঙা’। কবিতার ভাষায় শুনতে মধুর লাগলেও এর বাস্তবতা ভিন্ন। কালো মানুষকে ফর্সা করার প্রলোভন দেখিয়ে আজও বিক্রি করে হচ্ছে ত্বক ফর্সা করার ক্রিম। এরূপ ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হচ্ছে কই? দেশীয় এক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডে ছয়জনে একজন বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন। স্পেনের সংবাদমাধ্যম ‘এএস’ তথ্যমতে, ২০২১ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১০ বার স্প্যানিশ ফুটবলে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার ভিনিসিয়ুস। তাহলে আইন করে বর্ণবাদ বিলুপ্ত করার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কী? এরূপ অজস্র ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই।
পেশাগত ক্ষেত্রেও বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ করা যায়। বলা হয়, কোন কাজই ছোট নয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। কিন্তু আজকের সমাজে মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় না বরং তার পেশা কে মূল্যায়ন করা হয়। একজন মেথর, কুলি কিংবা মুচিকে সমাজে ছোট করে দেখা হয়। কিন্তু সরকারী বড় পদে চাকরিজীবী লোককে সম্মানের পাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কুলি-মজুর কবিতায় বলেছিলেন, ‘আসিতেছে শুভদিন, দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’। আসলেই কী শুভদিন এসেছে? কুলি-মজুররা কী তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু পেয়েছে। গণমাধ্যমের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী ১৭০ টাকা। অথচ এই মজুরীতে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। সন্তানদের লেখা-পড়া করানো কিংবা কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো আকাশ-কুশুম কল্পনার নামান্তর।
আবার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তো আছেই। কোন মুসলিম যদি হিন্দুর বাড়িতে খাবার খায় তাহলে নাকি সে হিন্দুর জাত যায়। আর কিছু মুসলিম তাদের খাবারের ভাগ কোন যাঞ্চাকারী হিন্দুকে দেওয়ার বেলায় দুইবার ভাবে। লালন শাহ এরূপ বৈষম্যের শিকার হয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা’। কবি নজরুল বিদ্রোহী কন্ঠে বলেছিলেন, ‘ভেঙ্গে ফেল ওই ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার’।
আইন পাশ করে কিংবা লেখালেখি করে কী আদৌ এসব বর্ণ বৈষম্য দূর করা গেছে? তাই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনা জরুরী। কেবল আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনই পারবে বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্যের মত সামাজিক ব্যাধি থেকে এ সমাজ কে মুক্ত করতে।

