হাম নিয়ে রাজনীতি বন্ধ হোক।
হামের প্রভাব ভয়ংকর ভাবে ছড়িয়ে পড়িয়েছে। নতুন মহামারীর সৃষ্টি হয়েছে। হামে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে পাঁচশ ছাড়িয়েছে। শিশুদের লাশের ভাড়ে, আজ বাংলা মায়ের কাধ নুয়ে পড়েছে। চারদিকে মা বাবা, আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি।
“চলতি বছরে (১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ৭৪ জন এবং বাকি ৩৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪০ হাজারের বেশি রোগী। দেশের ৫৮টি জেলায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।”
বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ একসাথে কাজ করছে—
১.টিকা না নেওয়া বা টিকা অসম্পূর্ণ থাকা
হাম খুব সংক্রামক রোগ। শিশুদের এমআর (Measles-Rubella) টিকার দুই ডোজ না থাকলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে আক্রান্তদের বড় অংশই “zero-dose” বা টিকা না পাওয়া শিশু।
২.কোভিডের পর টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি
করোনার সময় অনেক শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি। ফলে কয়েক বছরে অনেক “অরক্ষিত” শিশু জমে গেছে, এখন তাদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।
৩.অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
বাংলাদেশে অনেক শিশুই অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্ট শিশুদের শরীর হামের জটিলতা—যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণ—সহ্য করতে পারে না। এতে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।
৪.চিকিৎসা দেরিতে পাওয়া
অনেক পরিবার প্রথমে হাসপাতালে নেয় না বা দূরের কারণে দেরি হয়। তখন রোগ জটিল হয়ে যায়। বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত চাপের খবরও এসেছে।
৫.খুব ছোট শিশু বেশি আক্রান্ত
৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। এ বয়সে অনেক শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।
৬.হামকে “সাধারণ জ্বর” ভেবে অবহেলা করা
অনেকে ভাবেন হাম হলে এমনিতেই সেরে যাবে। কিন্তু হাম মারাত্মক হতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য।
কিন্তু এসব নিয়ে সচেতনতার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে “হাম নিয়ে রাজনীতি!” শিশুদের জীবনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, হাম নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করা। একদল আরেক দলকে দোষারোপ করছে। অথচ এত মৃত্যু এগুলো নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই। একদল বলছে আরেকদলের গাফিলতির কারণে এই শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে। আর একদল এসব নিয়ে কথা না বলে, কাকে দোষ দেয়া যায় তা ভাবছে! নাম উল্লেখ না করেই বলছি। সম্প্রতি একজন দোষ দিচ্ছেন শিশুদের মায়েদের! মায়েরা নাকি ফিটনেস ধরে রাখতে শিশুদের ব্রেস্টফিড করা থেকে বিরত থাকছেন। তাই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে! সত্যি? এতটা নিচে নেমে গেছি আমরা? মা শিশুর পবিত্র বন্ধনকে নিয়েও আমরা রাজনীতি করছি! ছি লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে! যে এই কথাটা বলেছে সে কি ভেবে বলেছে? বুকের দুধের বদলে শিশুদের ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো হয়। তার দাম জানে? ৫৫% মা নাকি এই কাজ করছেন! মানে বাংলাদেশের মানুষ এত বড়লোক হয়ে গেছেন যে, বিলাসিতার জন্য বাচ্চাকে ফর্মুলা খাওয়াচ্ছেন! এদের আইডিয়াও আছে এরা কি বলছে! মা শিশুর জন্য জান দিয়ে দেন। আমার নিজের চোখে দেখা, মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে চেয়েও পারছেন না পুষ্টিহীনতার জন্য। অপুষ্টির শিকার মায়েরা নিজেরাই খেতে পান না। তারা নাকি ফর্মুলা কিনে খাওয়াবেন ফিটনেসের জন্য! আপনাদের কাছে হাত জোড় করে অনুরোধ করছি হাম নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুন। মা শিশুর সম্পর্কে নিয়ে এই কুৎসিত মন্তব্য ছড়ানো বন্ধ করুন। আপনাদের ঘরেও তো মা আছেন। তাও এভাবে বলতে আপনাদের লজ্জা করে না।
বাংলাদেশের উন্নয়নে এখন এই নোংরা রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমাদের এখন নজর দিতে হবে কিভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায়। সরকারি হাসপাতালে সকল ধরনের দালালি বন্ধ করতে হবে, উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তার, নার্সদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনিক ভাবে সব কয়টি হাসপাতাল মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব হামের টিকা সকল শিশুর কাছে পৌঁছায় দিতে হবে। যারা এই হামের টিকা নিয়ে অবহেলা করেছে, দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সকল জায়গায় স্বেচ্ছাসেবকদের পাঠিয়ে সব মানুষকে হাম সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুন। বরং একত্রে সকল দল মিলে কাজ করুন তবেই একটি উন্নত বাংলাদেশ গঠন সম্ভব।
