প্লাস্টিক দূষণ : প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়।
মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ পাঠ: ১০ বার
https://epaper.ajkalerkhobor.net/index.php?cd=2026/06/18
- প্লাস্টিক দূষণ : প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়।
সুমনা আক্তার
হাতের এক টুকরো পলিথিন, মুহূর্তের মধ্যে যা আমরা ব্যবহার করে ফেলে দেই যেখানে সেখানে। এই বস্তুটির পরিবেশে থাকার মেয়াদ হতে পারে কয়েকশ বছর। এই বৈপরীত্যই আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পরিবেশগত সংকটের নাম। এক সময় প্লাস্টিককে আধুনিক সভ্যতার বিস্ময় হিসেবে দেখা হতো। হালকা, সস্তা, টেকসই, সহজলভ্য। আজ সেই প্লাস্টিক পরিণত হয়েছে পরিবেশের জন্য মারাত্মক বড়ো হুমকিতে। সমস্যাটির ব্যাপ্তি বুঝতে একটা তথ্যই যথেষ্ট। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮৭ হাজার টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্র জলে প্রবেশ করছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর মতো এক শহরেই দৈনিক প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্যের এক বড়ো অংশ প্লাস্টিক-পলিথিন। উদ্বেগের বিষয়, ৪৬ শতাংশ মানুষ কখনোই প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করেন না, আর ১৩ শতাংশ মানুষ এই বিষয়ে মোটেও সচেতন নয়। এই বিপুল বর্জ্য তাহলে যাচ্ছে কোথায়? উত্তরটা আমাদের চারপাশেই বাস্তবভাবে বিদ্যমান। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা তলিয়ে যায়— এর বড়ো কারণ ড্রেন-নালায় জমে থাকা পলিথিন। কিন্তু সমস্যা এখানেই থামবার নয়, এই বর্জ্য শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশে নদী, ক্রমান্বয়ে সাগরে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে আসা পানির বোতল, পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী বনের খাল ও চরে জমে গিয়ে জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে পতিত করছে। মাছ, কচ্ছপ, হাঙর, ডলফিনের মতো জলজ প্রাণী খাদ্য ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে, যার পরিণতিতে পরিপাকতন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে অসংখ্য প্রাণীর। প্লাস্টিকের এই করাল গ্রাস হতে আমরা মানুষেরা কি নিরাপদ? উত্তরটাও হতাশাজনক। সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। এত ক্ষুদ্র যে তা খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশ করছে আমাদের শরীরে। গবেষণায় এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে হরমোনজনিত জটিলতা, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের সঙ্গে। অর্থাৎ আজ আমরা যে প্লাস্টিক পরিবেশে ফেলে দিচ্ছি, কালক্রমে ফিরে আসছে আমাদের নিজেদের শরীরেই।
একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষিজমিতে জমে থাকা প্লাস্টিক মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে, পানি ও বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। সুস্থ মাটি ও বাস্তুতন্ত্র ছাড়া টেকসই কৃষি কল্পনা করা অসম্ভব। অথচ, প্লাস্টিক দূষণ ধীরে ধীরে সেই ভিত্তিটাই দুর্বল করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকটও। প্লাস্টিক তৈরি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, এবং উৎপাদন থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্গত হয় গ্রিনহাউজ গ্যাস। এই সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কি আদৌ আছে? আশার বিষয় হলো, পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যা ২০০২ সালেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন দুর্বল থেকে গেছে। তাই প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে নিষেধাজ্ঞার কঠোর প্রয়োগ— বাজার, দোকান ও শিল্প পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও জরিমানা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, একবার-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়, পাট ও কাগজের ব্যাগের ব্যবহারে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে বিকল্প পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকে। রিসাইক্লিং ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে বাড়ি বাড়ি প্লাস্টিক পৃথক্করণ একটি সহজ অভ্যাসে পরিণত হয়। প্লাস্টিক সংগ্রহ বুথ স্থাপন ও বৃক্ষরোপণের মতো ছোট ছোট স্থানীয় উদ্যোগও এক ধরনের দিকনির্দেশনা হতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ যদি দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়, তবে তা বড়ো পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তাহলে প্রশ্নটা শেষমেষ আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে— আজ আমরা যে প্লাস্টিকের সুবিধা ভোগ করছি, আগামী প্রজন্মকে যদি তার মূল্য দিতে হয় দূষিত নদী, অসুস্থ মাটি ও বিপর্যস্ত জীববৈচিত্র্যের রূপে, তবে সেই উন্নয়নের অর্থ কী? আইন আছে, সচেতনতার সূচনাও হয়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের সবাইকে প্রাকৃতিক পরিবেশকে পলিথিন হতে রক্ষা করায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।
লেখক :-
সুমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
ই-মেইল :-sumonaakter472192@gmail.com
Sent from Outlook for Android
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।