খেলাপি ঋণের কালো ছায়া ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আতঙ্ক।
মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ: ৮ জুন ২০২৬ পাঠ: ৩ বার
খেলাপি ঋণের কালো ছায়া ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয় আতঙ্ক।
সোমনা আক্তার
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের আর্থিক বা ব্যাংকিং খাত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতটি গভীর সুশাসনের সংকট, অনিয়ম এবং লাগামহীন খেলাপি ঋণের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক অস্থিরতা, একাধিক বড়ো ঋণ কেলেঙ্কারি এবং কিছু ব্যাংকে তীব্র তারল্য সংকটের কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মনে তীব্র উৎকণ্ঠা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায়, ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত সংস্কার এবং আমানতের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জাতীয় অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ভেঙে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতি সহায়তায় বড়ো আকারের ঋণ পুনঃতফশিলের মাধ্যমে এই অঙ্ক কাগজে-কলমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নামানো হয়েছে— তবে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগদ আদায় না বাড়িয়ে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার এই ছাড় দীর্ঘমেয়াদি সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। এই বিশাল খেলাপি ঋণের সিংহভাগই আটকে আছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের হাতে, এবং কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নামে-বেনামে বিপুল অর্থ উত্তোলন ও বিদেশে পাচারই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
ব্যাংক খাতের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের ওপর, যাঁরা তাঁদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখেন। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সরাসরি ফল হলো ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির অভাব। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯১ লাখ কোটি টাকা, যা আমানতকারীদের অর্থের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে তীব্র তারল্য সংকট চলছে, ফলে অনেক সাধারণ গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের জমানো টাকা তুলতে পারছেন না। অনাদায়ি ঋণের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় কিছু নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের মুখে পড়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থাকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমানতকারীরা এখন কেবল মুনাফার লোভে নয়, বরং পুঁজি হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকার কিছু ইতিবাচক সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেছে। তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক বাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের সঠিক হিসাব প্রকাশ করছে। বড়ো অঙ্কের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে গঠিত হয়েছে বিশেষ কমিটি। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া এবং ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সুশাসন ফেরানোর চেষ্টা চলছে। আমানতকারীদের সুরক্ষায় “আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫” অনুযায়ী বীমার সীমা পুরোনো ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে, যা দেশের ৯৩ শতাংশ আমানতকারীকে আওতায় আনবে এবং দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমাও ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১৭ কার্যদিবসে আনা হয়েছে। তবে এই সংস্কারগুলোর গতি অত্যন্ত ধীর এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আইনি প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। অর্থঋণ আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা এবং বড়ো খেলাপিদের উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বা রিট নিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এখনো ভাঙা সম্ভব হয়নি।
এই খাদের কিনারা থেকে ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে এখন কিছু কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্বীকার করেছিলেন যে, ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং বলেছিলেন, “ব্যাংক কোনো মালিকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, অপরাধ করলে কেউই ছাড় পাবে না।” একই সুরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনি ইশতাহারে ব্যাংকিং খাতকে সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এই লক্ষ্যে প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করতে হবে, যা ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে। বড়ো ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে কোনো ছাড় না দিয়ে, তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে, বারবার ঋণ পুনঃতফশিলের সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যেন কোনো মহলের রাজনৈতিক চাপ তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি যদি কঠোরভাবে দমন করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যাবে, যা সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে স্থবির করে দেবে। ঋণখেলাপি সিন্ডিকেটের হাত থেকে সাধারণ আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই কালক্ষেপণ না করে ব্যাংক খাতে আমূল, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত করাই হোক বর্তমান সময়ের মূল অঙ্গীকার।
লেখক :-
সোমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
ইমেইল :-sumonaakter472192@gmail.com
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।