বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

আশুরা: ঐতিহাসিক তাৎপর্য, কুসংস্কার ও করনীয়

Author

আজহারুল ইসলাম পিয়াস , Islamic University, Kushtia

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ২০ বার

‎মহররম মাস, ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম এবং চারটি পবিত্রতম মাসের একটি। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পবিত্র মাসটি বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার স্মৃতি বহন করে আসছে। এই মাসেই রয়েছে পবিত্র আশুরার দিন। ‎মহররমে সংঘটিত আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, এ দিবসের গুরুত্ব, প্রচলিত কুসংস্কার এবং আশুরাকে কেন্দ্র করে আমাদের করণীয় আমল সম্পর্কে জানব। ‎ ‎হিজরি বারোটি মাসের মধ্যে চারটি মাস হারাম তথা সম্মানিত। তন্মধ্যে তিনটি ধারাবাহিক– যিলক্বদ, যিলহজ, মহররম। আর চতুর্থটি হল, মুযার গোত্রের রজব, যা জুমাদাল উখরা (জমাদিউস সানি) ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী। (সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯) ‎এই মাসটি যেমন মর্যাদাপূর্ণ, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনা। ‎আসমান-জমীন সৃষ্টি থেকে শুরু করে কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ আশুরাকে কেন্দ্র করে পাওয়া যায়। সংক্ষেপে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা হলো– ‎ ‎আশুরার দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরশ, কুরসি, লাওহ, কলম, আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। এই দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়। জান্নাতে তাঁর প্রবেশ, পরবর্তীতে সংঘটিত ভুলের কারণে দুনিয়ায় অবতরণ এবং দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আরাফার ময়দানে হযরত হাওয়া (আ.)-এর সাথে পুনর্মিলনের ঘটনাও এই দিনের সাথে সম্পৃক্ত। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া) ‎হযরত নূহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং তাঁদের নৌকা জুদি পাহাড়ে অবতরণ করে। নমরুদের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে ইবরাহীম (আ.) মুক্তিলাভ করেন। দীর্ঘ আঠারো বছরের দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে হযরত আইয়ুব (আ.) আরোগ্য লাভ করেন। মাছের পেট থেকে চল্লিশ দিন পর হযরত ইউনুস (আ.) মুক্তি পেয়েছিলেন। হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর হারিয়ে যাওয়া পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। ‎ ‎হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাঈল ফিরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভ করেন। হযরত সুলাইমান (আ.)-কে গোটা দুনিয়ার রাজত্ব প্রদান করা হয়। হযরত ইদ্রিস (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং সেখানেই তাঁর রূহ কবজ করা হয়। হযরত ঈসা (আ.)-কে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। ‎ ‎ইসলামের ইতিহাসে আশুরার সাথে সংশ্লিষ্ট উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে মহানবী (সা.)-এর মদীনায় হিজরত, মুসলমানদের খায়বার, মাদায়েন ও কাদেসিয়ায় যুদ্ধে বিজয় এবং সর্বশেষ কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ কর্তৃক রাসুলুল্লাহর দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.)-এর নির্মম শাহাদাত। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যে মর্মান্তিক ঘটনা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, যেটি যুগে যুগে প্রতিটি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা জোগায়। ‎ ‎পবিত্র আশুরার বিশেষ আমলের ব্যাপারে হাদিসে নববীতে দুটি নির্দেশনা পাওয়া যায়। এক. রোজা রাখা, দুই. তাওবা ও ইস্তিগফার করা। ‎এই দিনে রোজা রাখার ফজিলত প্রসঙ্গে আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে আমি আশা পোষণ করি যে তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা গুনাহ) ক্ষমা করে দেবেন।’ (তিরমিজি: ৭৫২) ‎এমনকি মদিনার শিশুরা পর্যন্ত এই দিনে রোজা রাখার অভ্যাস করেছে। (বুখারি: ১৯৬০) ‎আশুরার রোজা রাখার উত্তম পদ্ধতি হলো, ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ বা ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা। ৯ তারিখে রাখতে পারলে ভালো। কারণ হাদিসে ৯ তারিখের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) যখন আশুরার রোজা রাখছিলেন এবং অন্যদের রোজা রাখতে বলেছিলেন তখন সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এ দিনকে তো ইহুদি-নাসারারা সম্মান করে? তখন নবীজি (সা.) এ কথা শুনে বলেন, ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব। বর্ণনাকারী বললেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। (মুসলিম: ২৫৫৬) ‎ ‎দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো বেশি পরিমাণে আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করা। কেননা বান্দার জন্য এ দিন তাওবার পরিবেশ সম্পূর্ণ অনুকূল থাকে। তাই বুদ্ধিমানদের উচিত তাওবা কবুলের প্রত্যাশিত এ দিনের কদর করা। এ প্রসঙ্গে হাদিসে নববীতে এসেছে, একবার এক সাহাবি নবীজির কাছে মহররমের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি রোজা রাখার পাশাপাশি তাওবার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৪১) ‎ ‎অনেকে মনে করেন, আশুরার দিবস শুধু কারবালার ঘটনার সাথেই সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে শিয়া মতাবলম্বীদের একটি অংশ এই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে নিজেদের শরীর থেকে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে রক্ত ঝরায়, যা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনায় গোটা উম্মাহ শোকাহত। তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামের নামে এমন কিছু করা যাবে না, যা ইসলামের বিধিবিধানের পরিপন্থী। ‎ ‎আশুরার তাৎপর্য শুধু কারবালার ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইতিহাস বলে, সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক হিসেবে এটি একটি তাৎপর্যমণ্ডিত দিন। এই দিনকে যথাযথভাবে পালন করব নফল রোজা ও তাওবার মাধ্যমে। মহান আল্লাহ আমাদের এই দিনের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন। ‎

লেখক: সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!